রিগন, আপনি আমাদের কাছেই আছেন
রিগন, আপনি আমাদের কাছেই আছেন
জলে কুমির, ডাঙায় বাঘ। সুন্দরবনে সত্যিকারের অবস্থা তখন এ রকমই। ভয়াল আরও সব প্রাণীও ছিল। সে রকম একটা জায়গায় জঙ্গল পরিষ্কার করে বসবাস শুরু করলেন ফাদার মারিনো রিগন। প্রথমে তিনি সেখানে একটি স্কুল ও একটি চার্চ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। পরে যুক্ত করেন একটি দাতব্য চিকিৎসালয়। সুন্দরবনের মোংলার শেলাবুনিয়ায় তাঁর সেই আখড়ায় সপরিবারে আমার যাওয়ার সুযোগ হয়েছিল। সঙ্গে ছিলেন আমার স্ত্রী নাজমা ও ছেলে অন্যতম। ফাদার রিগনের আমন্ত্রিত অতিথি হয়ে সেখানে অনেকেই গিয়েছিলেন। কিন্তু আমরা ছিলাম একটু ব্যতিক্রম অতিথি। সে কারণে ওই ভ্রমণ নিয়ে আমি একটু আবেগাপ্লুত ছিলাম।
ফাদার রিগন আমাদের পাঁচ দিন থাকার ব্যবস্থা করেছিলেন। আখড়ায় থেকে তাঁর ওপর ফটোগ্রাফি করি আমি। চার্চের ওই জায়গা ঘিরে তার যে জীবনযাপন, তা খুব কাছ থেকে কয়েক দিন দেখার সুযোগ আমার হয়েছিল। চার্চের একজন পাদ্রি কী করেন তা আমরা অনেকেই জানি। পাদ্রিরা বাইবেল থেকে পাঠ করেন, ধর্মীয় উপদেশ দেন। এর বাইরে কিন্তু তেমন কিছু করার কথা শোনা যায় না। ফাদার রিগন তা করতেন না। তিনি যা করতেন, তা দেখে আমি বিস্মিত হয়েছি।
এক রোববার সকালে দেখলাম তিনি তাঁর আলখাল্লা পরে চার্চে এলেন। সেদিন সেখানে সমবেত হয়েছিলেন গ্রামের বাসিন্দারা। ফাদার রিগন সেদিন বাইবেল থেকে পাঠ করলেন খুবই অল্প সময়। বেশি উপদেশ দিলেন রবীন্দ্রনাথ এবং লালন থেকে। বারবার তিনি লালন সাঁইজির কথা, তাঁর কোটেশন, তাঁর গান উল্লেখ করছিলেন। দেখে আমি অবাক হয়ে গেলাম। একজন ইতালিয়ান, সাদা চামড়ার বিদেশি এবং কট্টর খ্রিষ্টান ধর্মযাজক ফাদার! তিনি চার্চে বসে প্রার্থনার সময় কীভাবে একজন বাঙালি কবির, বাঙালি মরমী সাধকের কথা বলছেন। জসীমউদ্দীনের কথাও বলছিলেন। আমি অবাক হয়েছি এটা ভেবে, তিনি তাঁর মতো করে বাংলাদেশকে ধারণ করে দেশটার মুসলমান সাধক লালন সাঁই, কবি জসীমউদ্দীন, বাংলা সাহিত্যের বড় কবি রবীন্দ্রনাথকে সেখানে উপস্থাপন করছেন। সে এক অভিনব ঘটনা। জানি না, পৃথিবীর অন্য কোনো দেশে খ্রিষ্টান পাদ্রিরা এ রকম করেন কি না। শুনিনি কখনো। এসব দেখে আমার মনে হয়েছে, ফাদার রিগন অত্যন্ত সাহসী এবং খ্রিষ্টান যাজকদের মধ্যে ভিন্ন ধরনের। তাই যদি না হতো, ধর্মীয় বড় বড় প্রার্থনায়, যেখানে দশ-বিশ হাজার লোক জড়ো হতো, সে রকম জায়গাতেও লালন সাঁইজির বাণী, রবীন্দ্রনাথের বাণী তিনি বাইবেলের বাণীর পাশাপাশি শোনাতেন কীভাবে?
আমি ফাদারকে প্রশ্ন করেছিলাম, আপনি খ্রিষ্টানদের প্রার্থনা সভায় বাইবেলের পাশাপাশি রবীন্দ্রনাথের বাণী শোনাচ্ছেন কেন? তিনি বলেছিলেন, তাঁদের বাণী, তাঁদের চিন্তা ও দর্শন যিশুর দর্শনের সঙ্গে মিলে যায়। আমি একজন আধুনিক মানুষ। আমি তাদের অন্যভাবে দেখি না। আমি মনে করি, তাঁদের বাণী প্রচার করলে মানুষ শান্তিতে থাকবে, মানুষের মধ্যে হানাহানি কমে যাবে, মানুষের মধ্যে বন্ধুত্ব ও সম্প্রীতি তৈরি হবে।
ফাদারের আখড়ায় যেখানে মেয়েরা সেলাই করত, তিনি সেখানেও নিয়ে গেলেন আমাদের। দেখলাম, বিভিন্ন গ্রাম থেকে আসা বিভিন্ন বয়সের বহু মেয়ে সেলাই করছে। ফাদারের জন্য পাগল তারা। কেউ কেউ দেখলাম ফাদারের সঙ্গে খুনসুটি করছে, কেউ কৌতুক করছে, কেউ খোঁচা দিচ্ছে, কেউ চুল ধরে টানছে। হঠাৎ দেখলাম সুন্দরী একটা মেয়ে গাছ থেকে জবা ফুল ছিঁড়ে এনে ফাদারের কানে গুঁজে দিচ্ছে। ফাদারও দেখলাম সহাস্যে সেসব উপভোগ করছেন। বুঝলাম, তিনি অন্য রকম মানুষ। পৃথিবীর অন্য কোনো পাদ্রির সঙ্গে তাঁকে মেলানো যাবে না। তিনি এক ঐশ্বরিক জীবন যাপন করে গেছেন।
২০১১ সালে আমাদের মনে হলো ফাদার রিগনকে একটা সংবর্ধনা দেব। শেলাবুনিয়ায় গিয়ে তাঁর অনুমতি নিয়ে এলাম। তাঁকে আমরা নিয়ে গেলাম ফরিদপুরে। সংবর্ধনার মূল উদ্যোক্তা সংস্কৃতিকর্মী অধ্যাপক আলতাফ হোসেন। তিনি ছিলেন সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ, খুবই উৎসাহী মানুষ। আয়োজনটা করা হয়েছিল ফরিদপুর বাসস্ট্যান্ডের কাছে ফরিদপুর সারদা সুন্দরী উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ের বিশাল মাঠে। মেয়েরা নাচ করল, গান করল, রিগনের ওপর বক্তৃতা করল। সবকিছু মিলে একটা উৎসবের মতো হলো।
ফাদার রিগন সেখানে একটা বক্তৃতা দিলেন। কাগজ দেখে নয়, তাৎক্ষণিক। বিষয় ছিল ‘রবীন্দ্রনাথের নারী’। একজন ইতালীয় যাজক রবীন্দ্রনাথের নারী ভাবনা নিয়ে এত সাবলীলভাবে বললেন যে অনেক পণ্ডিত, যারা রবীন্দ্রনাথ নিয়ে গবেষণা করেন, তাদের পক্ষেও ও রকম এক ঘণ্টা বক্তৃতা দেওয়া সম্ভব কি না, জানি না। ফরিদপুরের দর্শকেরাও সেদিন বিস্মিত ও অভিভূত হয়েছিলেন। সেদিন ফাদারকেও আমরা চমকে দিয়েছিলাম। তাঁর ওপর আমরা একটা প্রদর্শনী করেছিলাম। ফরিদপুরের যত স্কুল ছিল, প্রায় সব স্কুলের ছেলেমেয়েরা ফাদার রিগনের ছবি আঁকল। যারা আঁকতে পারে না, তারা ফাদারকে নিয়ে লিখল। অনেক রকম ছবি জমা হলো সেই প্রদর্শনীতে। পাট দিয়ে তাঁর দাড়ি বানিয়েছিল একজন। অদ্ভুত সব বিষয় ছিল। সেসব দেখে রিগনের চোখ বড় বড় হয়ে গেল। তাঁর অভিব্যক্তি বলে দিচ্ছিল, জীবনে এ রকম কিছু তিনি কখনো দেখেননি। যখন তিনি ফরিদপুর ছাড়বেন, তখন পাঁচটি ঝুড়ি ভরে আমরা ওসব উপহার হিসেবে তাঁকে দিয়েছিলাম। সেগুলো নিয়ে শেলাবুনিয়ায় চার্চে খুব যত্নে রেখেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, এগুলো আমার জীবনের পরম সম্পদ, মানুষের ভালোবাসা লুকিয়ে আছে এসবের মধ্যে।
জন্মশতবর্ষে তাঁর সম্পর্কে এ রকম অনেক কিছু বলা যায়। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে বিরাট ভূমিকা ছিল তাঁর। বাংলাদেশের এই অকৃত্তিম বন্ধু শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের নাগরিক হয়েই মৃত্যুবরণ করেছেন। ফাদার চেয়েছিলেন বাংলাদেশের মাটিতেই, সেই সুন্দরবনের শেলাবুনিয়ায় চার্চের ভেতরে নির্ধারিত জায়গায় তাঁকে দাফন করা হবে। বার্ধক্যের কারণে তাঁকে ইতালি নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। ভিসেন্সায় তাঁকে সমাহিত করাও হয়েছিল। কিন্তু তাঁর শেষ ইচ্ছেটা পূরণ হয়েছে। প্রায় অলৌকিকভাবে তাঁর কফিন এক বছর পর বাংলাদেশে নিয়ে আসা হলো। রাষ্ট্রীয় সম্মাননা ও মর্যাদায় তাঁকে দাফন করা হলো শেলাবুনিয়ার সেই নির্ধারিত স্থানে।
ফাদার রিগন শুধু ইতালিয়ান ভাষায় রবীন্দ্রনাথ ও লালনকে সার্থকভাবে অনুবাদই করেননি, এত সুন্দর করে তিনি রবীন্দ্রনাথের কবিতা আবৃত্তি করেছেন, সেটা শুনে মনে হচ্ছিল, সেটা বৃদ্ধ রিগনের নয়, ঐশ্বরিক কোনো কণ্ঠ। তিনি যখন সেটা রেকর্ড করেন, তখন তাঁর বয়স ৮০ বা ৮৫ বছর হবে। ঢাকায় হওয়া একটা রেকর্ড শুনে আমি বিস্মিত হয়ে যাই, কত বড় প্রতিভা ছিলেন তিনি। আজ পরম শ্রদ্ধায় তাঁকে স্মরণ করি। এ রকম একজন ঋষি, বাংলাদেশের অকৃত্তিম বন্ধু ও ত্যাগী মানুষকে আমরা আর ফিরে পাব না।
রিগন, আমরা আপনাকে সব সময় মনে রাখব। আপনি আমাদের কাছেই আছেন। আপনি বাংলাদেশের প্রকৃতি ও মাটিতে মিশে আছেন।
- লেখক: আলোকচিত্রশিল্পী