হাউজ দ্যাট, আম্পায়ার?

screenshot_2026-01-03_123421

কঙ্কি বিডলের মহান প্রেমের কাহিনি শুরু হয়েছিল জুনের এক পড়ন্ত বিকেলে, লন্ডনের মেরিলিবোন এলাকায়। ঘড়িতে তখন পৌনে সাতটা। সারা দিন লর্ডসের মাঠে ক্রিকেট ম্যাচ দেখে ফেরার পথে বেচারা আটকা পড়েছে ট্রাফিক জ্যামে। তার ট্যাক্সির গা ঘেঁষেই ব্রেক কষে দাঁড়িয়েছে আরেকখানা গাড়ি—আর তার স্টিয়ারিংয়ে এক তরুণী। কঙ্কি সবে একটা সিগারেট ধরিয়ে দুনিয়াদারি নিয়ে ভাবছিল, এমন সময় কানে এল তরুণীর বাণী:

‘ক্রিকেটও একটা খেলা হলো? ঘুমের ঘোরে হেঁটে বেড়ানোর একটা ফালতু বাহানামাত্র।’

ব্যস! প্রেমের রেশমি ফাঁস তৎক্ষণাৎ কঙ্কির গলায় এঁটে বসল। উত্তেজনায় সে জাম্পিং বিনের মতো সিটের ওপর এমন এক লাফ দিল যে হাতের জ্বলন্ত সিগারেট খসে পড়ল কোথায়, তার ঠিক নেই। এমন কথা যে মেয়ে বলতে পারে, সে যদি ‘ড্রিম গার্ল’ না হয়, তবে এই অধম জানে না স্বপ্নের মানসী কাকে বলে!

তবে একে ঠিক প্রথম দর্শনে প্রেম বলা যাবে না। কারণ, দর্শনটাই ঠিকমতো হয়নি। কঙ্কি আর ওই সুন্দরীর মাঝখানে চীনের মহাপ্রাচীরের মতো বসে ছিল এক হৃষ্টপুষ্ট ‘ব্লাইটার’—পরনে নীল ফ্লানেলের পিন-স্ট্রাইপ স্যুট। তার জন্য মেয়েটিকে দেখাই দায়। কঙ্কির সম্বল কেবল ওই কণ্ঠ, তবে ওটুকুই বা কম কিসে? গলা তো নয়, কানে বাজল যেন আমেরিকান সুর। কঙ্কির মনে হলো, তরুণী নিশ্চয় স্বর্গ থেকে নেমে আসা কোনো আমেরিকান পরী, লন্ডনে হয়তো দুদণ্ড জিরিয়ে নিতে এসেছে।

‘এরপর যদি পাঁচ হাজার বছর বাদেও আরেকটা ক্রিকেট ম্যাচ দেখি, তবে সেটাও বড্ড তাড়াতাড়ি হয়ে যাবে,’ বলল মেয়েটি।

সঙ্গীটি অবশ্য এসব কথাবার্তা বরদাশত করতে পারল না। নাক-মুখ কুঁচকে বেশ কড়া সুরে বলল, আজ বিকেলের খেলাটা আসল ক্রিকেট নয়, বৃষ্টিতে সব পণ্ড হয়েছে।

শুনে মেয়েটি জবাব দিল: ‘ও তো উপরওয়ালার খাস রহমত! খেলার নামে দিনভর এই উৎপাতের চেয়ে খেলা না হওয়া অনেক ভালো। আমার মতে আদর্শ ক্রিকেট ম্যাচ সেটাই, যেখানে সারা দিন মুষলধারে বৃষ্টি হবে, আর দুই টিমের খেলোয়াড়েরা যে যার ঘরে বসে শব্দজট সমাধান করবে।’

ততক্ষণে যানজট খুলে গেছে। কঙ্কির ট্যাক্সি নড়ার আগেই মেয়েটির গাড়ি বি-২৯ বোমারু বিমানের মতো সোঁ করে বেরিয়ে গেল।

তরুণ বিডলের মনে মেয়েটির কথা যে এমন গেঁথে গেল, তার অবশ্য একটা জবরদস্ত কারণ আছে। দুনিয়ার তাবত জিনিসের মধ্যে কঙ্কি যদি কিছু দুচোখে দেখতে না পারে, সেটা হলো ক্রিকেট। অবশ্য এর চেয়েও জঘন্য দুটো বস্তু তার লিস্টে আছে—এক হলো বাগানের পিচ্ছিল শামুক, আর দুই তার চাচা লর্ড প্লাম্পটন। ছেলেবেলায় কঙ্কিকে জোর করে ক্রিকেট খেলানো হতো, আর এখন সাবালক হয়েও নিস্তার নেই—জোর করে দেখানো হয়। এই দুনিয়ায় সংবেদনশীল মানুষের দুঃখের তো অন্ত নেই বটে। কিন্তু মানুষ যখন পায়ে প্যাড বেঁধে হাঁসের মতো হেলেদুলে মাঠে নামে আর চ্যাঁচায় ‘হাউজ দ্যাট, আম্পায়ার?’—তখন কঙ্কির মনে হয়, এর চেয়ে করুণ দৃশ্য আর হয় না।

লর্ড প্লাম্পটনের হুকুম, ক্রিকেট দেখতে হবে। অমান্য করার জো নেই; কারণ, কঙ্কির তিন বেলার আহার ওই চাচারই হাতে। সেই কবেকার টপ হ্যাট আর গালপাট্টা দাড়িওয়ালা খেলোয়াড়দের ব্যাটিং গড়ও লর্ড প্লাম্পটনের ঠোঁটস্থ। ডিনারের পর কঙ্কিকে ধরে তিনি সেই ফিরিস্তি শোনাতে বসেন। কখনো আপেল, কখনো শীতকালীন কমলালেবু হাতে নিয়ে তিনি দেখিয়েও দেন, কেন্টের বজার কীভাবে আঙুল ঘুরিয়ে বল স্পিন করাতেন কিংবা চটচটে উইকেটে বল কেমন মতো বাঁক নিত। প্রায়ই এমন হয়, কঙ্কি হয়তো রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে চাচার পকেট থেকে একটা দশ পাউন্ডের নোট খসানোর ফন্দি আঁটছে, ঠিক সেই সময়ে চাচা দাঁড়িয়ে পড়েন। হাতের ছাতা দিয়ে দেখাতে শুরু করেন সাসেক্সের কজার কীভাবে স্লিপ দিয়ে লেট কাট মারতেন। বেচারা কঙ্কির আর টাকা চাওয়া হয় না।

এই দরাজদিল মহাপুরুষের ডেরাতেই ফিরছিল কঙ্কি। বাড়ির উপরতলায় তার একটা খুপরিঘর আছে। বাড়ি ফিরে দেখে এলাহি কাণ্ড। ডাক্তাররা সব কালো ব্যাগ হাতে সিঁড়ি দিয়ে নামছেন, আর পারলারমেইডরা বার্লির বাটি হাতে হন্তদন্ত হয়ে ছুটছে ওপরে। বাটলারের কাছে শোনা গেল, লর্ডের গোড়ালি মচকেছে।

‘বলো কী?’ কঙ্কির মন ভালো হয়ে গেল। চাচার যদি কেন্নোর মতো এক শটা পা থাকত আর সব কটা মচকে যেত, তাতেও খুশি হতো সে। ‘যাই তবে, লাশের কী হাল একটু দেখে আসি।’

কঙ্কি গিয়ে হাজির হলো খানদানি শোবার ঘরে। দেখল, বিছানায় বালিশে পাহাড়ে ঠেস দিয়ে আধশোয়া হয়ে আছেন চাচা। মেজাজটা যে সুবিধের নয়, দেখেই বোঝা যাচ্ছে। হাতের কাছে বাটিভর্তি বার্লি ছিল, ছুড়ে মারছেন বেচারি পারলারমেইডের দিকে। চেহারাটা হয়েছে খুনির মতো। তবে মুশকিল হলো, ডাকাতদের মুখেও মাঝেমধ্যে যেটুকু দিলদরিয়া ভাব দেখা যায়, চাচার মুখে আজ তার ছিটেফোঁটাও নেই। কঙ্কির দিকে অগ্নিদৃষ্টি হানলেন। চোখে আফসোস স্পষ্ট—ইশ, হাতের বার্লিটুকু ফুরিয়ে গেল, নইলে ওটা দিয়েই ভাতিজাকে অভ্যর্থনা জানানো যেত।

‘কী খবর, আঙ্কেল এভারার্ড?’ বলল কঙ্কি। ক্লাবে-আড্ডায় তো জোর গুজব, তোমার নাকি হাড়গোড় ভেঙে একাকার। ঘটনাটা কী?’

কপালের ভাঁজ গভীর হলো লর্ড প্লাম্পটনের। চেহারাটা এখন আলসারের ব্যথায় কাতর কোনো গণহত্যাকারীর মতো দেখাচ্ছে।

‘কী হয়েছে বলছি শোনো। মনে আছে নিশ্চয়, তোমাকে লর্ডসে রেখে ক্লাবের মিটিংয়ে গিয়েছিলাম আমি? ফেরার পথে দেখি রাস্তায় ক্রিকেট খেলছে একদল বাচ্চা। একজন ব্যাট হাঁকিয়ে বল তুলে দিল আকাশে, এক্সট্রা কাভারে। ক্যাচটা ধরার জন্যে স্বভাবতই রাস্তায় নেমে গেলাম আমি। ঠিকঠাকমতো ধরেও ফেলেছিলাম। কিন্তু তখনই কোত্থেকে এক পাগলি মেয়ে নব্বই মাইল স্পিডে গাড়ি চালিয়ে এসে ধাক্কা মারল আমাকে। উল্টে গিয়ে পড়লাম।’ জিব দিয়ে ঠোঁট চাটলেন লর্ড প্লাম্পটন। ‘কোনো একদিন নিশ্চয় মেয়েটাকে বাগে পাব। অন্ধকার কোনো গলিতে পেলে তো কথাই নেই। ভোঁতা একটা ছুরি দিয়ে জ্যান্ত চামড়া ছাড়াব ওর। তারপর ফুটন্ত তেলে চুবিয়ে আলাদা করব হাত-পা। ফুটপাতে ওগুলো সাজিয়ে তার ওপর নাচব।’

‘উচিত কাজ,’ সায় দিল কঙ্কি। ‘তোমার গোড়ালি মচকে দিয়ে কালকের লর্ডসে যাওয়া আটকে দিল যে মেয়ে, তাকে কড়া শিক্ষাই দেওয়া দরকার।’

‘আটকে দিল মানে?’ খেঁকিয়ে উঠলেন লর্ড প্লাম্পটন। ‘সামান্য মচকানো পা আমাকে ক্রিকেট ম্যাচ দেখা থেকে আটকাতে পারবে ভেবেছ? আমি যাবই, তুমিও থাকবে আমার সাথে। আর এখন…’ কথার খেই হারিয়ে ক্লান্ত শোনাল তাঁকে, ‘দূর হও চোখের সামনে থেকে! জাহান্নামে যাও!’

কঙ্কি অবশ্য জাহান্নামে গেল না, গেল নিচের বারান্দায়—একটু খোলা হাওয়া খেতে। মনটা খুব খারাপ। ভেবেছিল কালকের দিনটা ছুটি পাবে। ফের যখন ভেতরে ঢুকতে যাবে, ঠিক তখনই কানে এল গাড়ির ব্রেক কষার আওয়াজ। পেছনে এসে দাঁড়িয়েছে একটা গাড়ি।

‘এক্সকিউজ মি,’ মিহি গলায় বলে উঠল কেউ। ‘লর্ড প্লাম্পটনের সাথে দেখা করা যাবে?’

সাধারণ কটা কথা, কিন্তু ওই রুপালি গলার আওয়াজ শুনে কঙ্কির অবস্থা শোচনীয়। জেলমাখানো পরিপাটি চুল থেকে জুতোসুদ্ধ পায়ের তলা পর্যন্ত ঝনঝন করে কেঁপে উঠল। তার মুখ দিয়ে ঘোড়ার মতো একটা অদ্ভুত চিঁহি শব্দ বের হলো। ঘুরল সে। এই প্রথম মেয়েটার মুখ দেখার সৌভাগ্য হলো। দেখেই মুখ হাঁ হয়ে গেল। কিন্নর কণ্ঠস্বর তো বটেই, চেহারাটাও সেই কণ্ঠের সঙ্গে পাল্লা দেওয়ার মতো।

কঙ্কিকে দেখে মেয়েটিরও দম আটকে এল। কঙ্কি বিডলকে প্রথমবার দেখলে নারীজাতির অবশ্য এমন হালই হয়। মাথায় ঘিলু কম হলে কী হবে, বাইরের খোলসটা রাজপুত্রের মতো। কেরি গ্র্যান্ট বা গ্রেগরি পেকও তার সামনে ম্লান।

‘এই যে,’ গাড়ির পাদানিতে এক পা তুলে দিয়ে বলল কঙ্কি। ‘ভুল শুনলাম কি না কে জানে, মনে হলো আপনি আমার চাচা লর্ড প্লাম্পটনের সাথে দেখা করতে চাইছেন?’

‘ঠিকই শুনেছেন। একটু আগে গাড়ি দিয়ে ওনাকে রাস্তার সঙ্গে প্রায় মিশিয়ে দিয়েছিলাম, তাই ভাবলাম কিছু ফুল দিয়ে আসি।’

কঙ্কি আঁতকে উঠল। ‘না, না, ও-কাজ করবেন না! বন্ধু হিসেবেই বলছি। যা রেগে আছেন, এখন সামনে গেলে আস্ত চিবিয়ে খাবেন। মেজাজ ঠান্ডা হতে অনেক সময় লাগবে চাচার।’

‘বুঝলাম। তাহলে ফুলগুলো মোড়ের দোকান থেকে কোনো মেসেঞ্জার বয়কে দিয়ে পাঠিয়ে দেব। হাউজ দ্যাট, আম্পায়ার?’

শিউরে উঠল কঙ্কির। এমন এক অপ্সরীর মুখে কিনা এমন অলক্ষুণে কথা!

‘গুড গড!’ চেঁচিয়ে উঠল সে। ‘এই অশ্লীল কথাটা কোথায় শিখলেন?’

‘আপনার চাচার কাছে। ওঁকে যখন গাড়ি দিয়ে ধাক্কা দিলাম, তখন উনি গলা ফাটিয়ে এটাই চেঁচাচ্ছিলেন। মনে হয় মাথার স্ক্রু ঢিলা। তা এর মানেটা কী?’

‘ক্রিকেটে বলে এটা।’

‘ক্রিকেট!’ কেঁপে উঠল মেয়েটা। ‘ক্রিকেট নিয়ে আমার কী মত, শুনবেন?’

‘শোনা হয়ে গেছে। আজ সন্ধ্যায় ট্রাফিক জ্যামে আপনার গাড়িটা ছিল ঠিক আমার ট্যাক্সির পেছনে। আমি ছিলাম এখানে, আর আপনি ওদিকটায়—তাই ক্রিকেট নিয়ে আপনার ওই অমৃতবচন আমি প্রাণভরে শুনেছি। আনন্দের চোটে চোখে পানি এসে গিয়েছিল আমার। আপনাকে একটা ধন্যবাদ দিতে পারি?’

‘অবশ্যই। কিন্তু আপনি ক্রিকেট পছন্দ করেন না? আমি তো ভাবতাম সব ইংরেজই ক্রিকেট বলতে অজ্ঞান।’

‘সবাই হতে পারে, কিন্তু এই বান্দা নয়। ক্রিকেট দেখলেই আমার গা জ্বলে যায়।’

‘আমারও তা-ই। লর্ডসের ত্রিসীমানায় যাওয়া আমার উচিত হয়নি। কিন্তু কী করব বলুন, এক দুর্বল মুহূর্তের সুযোগ নিয়ে আমার হবু বর পটিয়ে ওখানে নিয়ে গিয়েছিল।’

কঙ্কির মাথা চক্কর মারল।

‘হায় খোদা! আপনার আবার একখানা হবু বরও আছে নাকি?’

‘আপাতত নেই।’

কঙ্কির মাথার ঘূর্ণি থামল।

‘গাড়িতে বসা ওই ছেলেটার কথাই বলছেন তো?’

‘হ্যাঁ। নাম ইউস্টেস ডেভেনপোর্ট-সিমস। অ্যাসেক্স না সাসেক্স, কোথায় যেন ক্রিকেট খেলে। আমার কথাবার্তা ওর কাছে বড্ড বিদ্রোহী লাগল, তাই খানিক কথা-কাটাকাটির পর বিয়ের কেকের অর্ডারটা ক্যান্সেল করতে হলো।’

‘ওকে একটু নাক-উঁচু মনে হচ্ছিল।’

‘একটু না, ভালোই।’

‘ক্রিকেটারকে বিয়ে না করে খুব সমঝদারের কাজ করেছেন।’

‘আমারও তা-ই মনে হলো।’

‘তাহলে মোদ্দাকথা হলো—ধোঁয়া কেটে গেছে, ময়দান এখন ফাঁকা, আর আপনি এখন আবার মুক্ত?’

‘হ্যাঁ।’

‘চমৎকার!’ কঙ্কির মাথায় হঠাৎ একটা বুদ্ধি খেলে গেল। ‘বলছি কী, আপনার ওই ছোট্ট হাতখানা একটু চেপে ধরলে কি কিছু মনে করবেন?’

‘অন্য কোনো সময় হবে।’

‘আপনার যখন মর্জি।’

‘আসলে আমাকে এখনই হোটেলে ফিরে কাপড়চোপড় বদলাতে হবে। এমনিতেই দেরি হয়ে গেছে, আর খাওয়াদাওয়ার জন্য বসে থাকতে হলে বাবা আবার ভুখা হায়েনার মতো চেঁচাতে শুরু করেন।’

এই বলে সুঠাম পায়ে অ্যাকসেলেটরে চাপ দিয়ে দু-চাকায় ভর করে ঝড়ের বেগে মোড়ের ওপারে হাওয়া হয়ে গেল মেয়েটি। কঙ্কি ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল সেদিকে, বুকে তখন সাহারা মরুভূমির হাহাকার। হঠাৎ খেয়াল হলো—নাম-ধাম, ফোন নম্বর কিচ্ছু জানা হয়নি। সম্ভবত এটাই শেষ দেখা। ‘রাতের আঁধারে ক্ষণিকের দেখা’—এই প্রবাদটা জানা থাকলে কঙ্কি নিশ্চয়ই দাঁতে দাঁত চেপে ওটা আওড়াত।

পরদিন সকালে চাচার সঙ্গে লর্ডসে চলল কঙ্কি। মনটা বিষাদে ছেয়ে আছে। মনে হচ্ছে জাঁতাকলে পিষে কেউ যেন সব রস নিংড়ে বের করে নিয়েছে শরীর থেকে। এমন একটা ফার্স্ট ক্লাস মেয়ে জীবনে এল আর ভনভন করে উড়ে চলে গেল—কোনো হদিস রেখে গেল না—ভাবতেই বুকটা ফেটে যাচ্ছে তার।

ক্রিকেটের মক্কা লর্ডসে যাওয়ার পথে লর্ড প্লাম্পটন ১৯২১ সালের অস্ট্রেলিয়ান টিমের কেচ্ছা বয়ান করছিলেন, কিন্তু কঙ্কির কান তখন অন্যদিকে। এতটাই অন্যমনস্ক যে চাচা মেজাজ হারিয়ে ওর পাঁজরে গুঁতো মেরে বললেন, ‘ওরে, ব্যাঙ-চোখো গর্দভ!’ তা কঙ্কি তো তখন সত্যিই এক বিরহী গর্দভ!

প্যাভিলিয়নে বসেও ঘোর কাটল না কঙ্কির। তবে সেটা কারোর চোখে পড়ল না, কারণ, বাকিরাও তখন ঝিমোচ্ছে। মাঠের মাঝখানে খেলোয়াড় নামের জিন্দালাশগুলো টলতে টলতে এদিক-ওদিক করছে, আর গ্যালারির দর্শকেরা সিটে গা এলিয়ে দিয়ে চোখ উল্টে রয়েছে।

ঘণ্টাখানেক ধরে মাছি মারা ছাড়া আর কিছুই হলো না। হঠাৎ মিডলসেক্সের হেজার, যেন ধ্যানমগ্ন ঋষির মতো গভীর ঘুম থেকে জেগে উঠে, ব্যাট ছোঁয়াল একটা উঠে আসা বলে। গালিতে দাঁড়ানো এক ফিল্ডারও ঘুমাচ্ছিল প্রায়, বলটা গিয়ে জমা হলো তার হাতে।

এতক্ষণ শুধু বিড়বিড় করে ‘নাইস! নাইস!’ করছিলেন লর্ড প্লাম্পটন। আচমকা যেন ভিমরুলের কামড় খেয়ে সোজা হয়ে বসলেন। ‘হা খোদা!’ বলে তিনি কটমট করে তাকালেন পাশের প্যাভিলিয়নের তিন শিলিং দামের সস্তা সিটগুলোর দিকে। কঙ্কিও তাকাল সেদিকে। চোখ ফেরাতেই তার কলজেটা চারবার ডিগবাজি খেয়ে ঝড়ের মুখে পড়া জেলিফিশের মতো থরথর করে কাঁপতে লাগল।

প্লাম্পটন তখনো রহস্যোপন্যাসের ভিলেনের মতো সেই তিন শিলিংয়ের সিটের দিকে তাকিয়ে আছেন। দাঁতে দাঁত চেপে বললেন, ‘ওই তো সেই ডাইনিটা!’

দুনিয়ার সেরা সুন্দরী ললনাকে কেউ ‘ডাইনি’ বললে কঙ্কির পিত্তি জ্বলে যায়। মুহূর্তের জন্য তার ইচ্ছে হলো, আত্মীয়তার তোয়াক্কা না করে চাচার থ্যাবড়া নাকে কষিয়ে একখানা ঘুষি বসিয়ে দেয়। কিন্তু পরক্ষণেই শুভবুদ্ধি উদয় হলো। নিজেকে সামলে নিয়ে সে বলল, ‘হ্যাঁ, ওই তো ও।’

লর্ড প্লাম্পটন অবাক। ‘চেনো নাকি?’

‘অল্পস্বল্প। কাল রাতে আমার ঘাড়েও এসে পড়েছিল।’

‘তোমার ঘাড়েও? হায় খোদা! এ মেয়ে তো দেখছি সাক্ষাৎ আপদ! একে এভাবে ছেড়ে রাখলে তো লন্ডনের জনসংখ্যা অর্ধেক করে দেবে। যাই, গিয়ে দু-কথা শুনিয়ে দিয়ে আসি।’

‘কিন্তু আঙ্কেল, তোমার গোড়ালি।’

‘কী আবোলতাবোল বকছ?’

‘বলছি তোমার গোড়ালির কথা। মচকানো পা নিয়ে হাঁটাহাঁটি করা ঠিক হবে না। তার চেয়ে আমিই যাই? তোমার হয়ে ধমকে দিয়ে আসি?’

প্লাম্পটন একটু ভাবলেন।

‘হ্যাঁ, আইডিয়াটা মন্দ না। তোমার মতো গর্দভ যে এমন কাজের কথা বলবে, ভাবিনি। যাও, খুব কড়া করে ধমকে দেবে কিন্তু।’

‘তা আর বলতে!’ একগাল হেসে বলল কঙ্কি।

উঠে পড়িমরি করে ছুটল সে। ওদিকে লর্ড প্লাম্পটন তাঁর বাঁ-পাশে বসা আধা-ঘুমন্ত দর্শকের সঙ্গে তর্কে জুড়ে দিলেন—১৯০৪ সালে গ্লুচেস্টারশায়ারের ডিসিএল ওজার স্কয়ার লেগে ফিল্ডিং করেছিল নাকি এক্সট্রা কাভারে।

কাল রাতের আধো আলোয় মেয়েটাকে যদি পরী মনে হয়ে থাকে, আজ এই ঝলমলে রোদে তাকে মনে হচ্ছে প্রথম শ্রেণির অপ্সরা। ছিপছিপে গড়ন, মাঝারি উচ্চতা। চোখ আর চুল বাদামি। মনে হচ্ছে যেন প্রচুর ইস্ট খাওয়া হৃষ্টপুষ্ট, তেজদীপ্ত অপ্সরা মর্ত্যে নেমে এসেছে।

‘হ্যালো,’ ধপ করে মেয়েটার পাশের সিটে বসে পড়ল কঙ্কি। ‘আবার দেখা হয়ে গেল, তাই না?’

চমকে উঠল মেয়েটা। কঙ্কির সুন্দর কামানো চেহারা আর নীল চোখের দিকে তাকিয়ে তার বুকের ভেতরটা কেমন যেন ধড়ফড় করে উঠল।

‘তুমি!’ চেঁচিয়ে উঠল সে। ‘এখানে কী করছ?’

‘ক্রিকেট দেখছি।’

‘সে কী! কালই তো বললে ক্রিকেট দেখলে তোমার পিত্তি জ্বলে যায়!’

‘তা বলেছিলাম। কিন্তু কী করব বলো, কপাল! চাচা এই জঘন্য খেলাটার পাগল। আর আমি তার দয়ার ওপর বেঁচে আছি। তাই উনি যখন বলেন ‘চলো বাছা ক্রিকেট দেখি’, তখন আমাকেও শিকারি বিড়ালের মতো ল্যাজ নাড়িয়ে দেখতে হয়।’

ভুরু কুঁচকে গেল মেয়েটার। হতাশ হয়েছে মনে হলো।

‘চাচার দয়ার ওপর বেঁচে আছ কেন? একটা চাকরিবাকরি জোগাড় করতে পারো না?’

কঙ্কি চটজলদি সাফাই গাইল: ‘চাকরি তো পাই! ডজন ডজন পাই। কিন্তু কোনোটাই টেকে না। আসল সমস্যা হলো, বুঝলে, আমার মাথায় ঘিলু একটু কম।’

‘তাই নাকি?’

‘হ্যাঁ। একদম। সে জন্যই তো লোকে আমাকে “কঙ্কি” বলে ডাকে।’

‘ওহ, এই জন্যই বুঝি নাম কঙ্কি?’

‘সবাই। স্কুলে এক শিক্ষক বলেছিলেন—বিডল, তোর মাথায় কিছু ঢোকানো আর পাথরে পেরেক ঠোকা সমান। খোদা তোর খুলির ভেতর মগজের বদলে নিরেট কংক্রিট ঠেসে দিয়েছেন। সেই থেকে সবাই আমাকে কঙ্কি বলে ডাকে।’

‘আচ্ছা! তা কী কী চাকরি করেছ শুনি?’

‘চ্যান্সেলর অব দ্য ডাচি অভ ল্যাঙ্কাস্টার ছাড়া প্রায় সব চাকরিই করেছি।’

‘আর প্রতিবারই ছাঁটাই হয়েছ?’

‘প্রতিবার।’

‘ইস! শুনে খারাপ লাগল।’

‘সহানুভূতির জন্যে ধন্যবাদ। তবে চিন্তা নেই, সব ঠিক হয়ে যাবে। তবে আসলে ব্যাপারটা অতটা খারাপও নয়।’

‘খারাপ নয় মানে?’

কঙ্কি একটু আমতা-আমতা করল। তারপর ভাবল, অমন মানুষরূপী পরীকে যদি বিশ্বাস করে কোনো কথা বলা না যায়, তবে আর কাকে বলবে? এদিক-ওদিক তাকাল একবার। তিন শিলিংয়ের সস্তা গ্যালারিতে ওরা দুজন ছাড়া কাকপক্ষীও নেই।

‘কথাটা কিন্তু একদম পেটের ভেতর হজম করে ফেলতে হবে, টুঁ শব্দটিও করা যাবে না। অতি গোপন ব্যাপার। আমি কিন্তু কদিনের মধ্যেই বিশাল সম্পত্তি হাতে পাব। সমুদ্রের পানি চেনো তো?’

‘নিউইয়র্ক থেকে আসার সময় জাহাজ ভাসিয়ে রাখে যে জিনিসটা?’

‘ঠিক ধরেছ। তুমি হয়তো জানো না, ওই পানিতে প্রচুর সোনা আছে। ম্যাকস্পোরান নামে এক লোকের সঙ্গে খাতির হয়েছে আমার। পানি থেকে সোনা বের করার গোপন কায়দা জানে ও। খবরের কাগজে বিজ্ঞাপন দিয়েছিল, যে আগে টাকা ঢালবে তাকেই পার্টনার নেবে। ব্যস, আমিও দে ছুট, দিলাম টাকা জমা। লোকটা মানুষ ভালো, আমাকে বিনা বাক্যব্যয়ে পার্টনার করে নিল। আমার পকেটে দশ পাউন্ড ছিল, ওটাই দিয়েছি। ও বলেছে, কম করে হলেও আড়াই লাখ পাউন্ড ফেরত পাব আমি। লাভটা মন্দ না, কী বলো?’

‘খুবই ভালো।’

‘হ্যাঁ, ঠিকঠাকই এগোচ্ছে সব। আসলে শুধু টাকাপয়সার কথা ভাবছি না আমি, ভাবছি বিয়ের কথা। মানে, যদি বিয়েশাদি করার ইচ্ছে থাকে আর কী।’ মেয়েটির দিকে বিগলিত দৃষ্টি হানল কঙ্কি। ‘সোজা কথায়, মনের মতো কোনো মেয়ে পেলে এখন আমি প্রেমের তরিটা বাস্তবের ঘাটে ভেড়াতে পারব।’

‘বুঝেছি।’

‘আসলে,’ আরেকটু ঘেঁষে বসল কঙ্কি, ‘ভাবছি এখনই প্ল্যানটা করে ফেলব।’

‘এটাই তো আসল স্পিরিট। আমার বাবার একটা স্লোগান আছে—”শুভস্য শীঘ্রম”। উনি একজন টাইকুন।’

‘টাইকুন? ওটা তো এক জাতের ঝড়, তাই না?’

‘উঁহু, মিলিয়নিয়ার।’

‘তোমার বাবা মিলিয়নিয়ার?’

‘হ্যাঁ। দিনকে দিন টাকার পাহাড় শুধু উঁচুই হচ্ছে।’

‘তাই নাকি?’

মুহূর্তে কর্পূরের মতো উবে গেল কঙ্কির ফুরফুরে মেজাজ। গায়ে যেন হঠাৎ হিমেল হাওয়া লাগল। জীবনে সে একটা বিষয়েই কসম খেয়েছিল—টাকার লোভে বিয়ে সে কস্মিনকালেও করবে না। বছরের পর বছর ধরে তার ছয় চাচা আর সাত ফুফু কানের কাছে ঘ্যানঘ্যান করেছে—তোমার ওই চাঁদবদনখানা লাগাও, বাবা, কোনো বড়লোকের দুলালীকে পটিয়ে বিয়ে করে ফেলো। ভেড়ার পালের মতো একের পর এক ধনী উত্তরাধিকারীদের ওর সামনে প্যারেড করিয়েছে তারা। কিন্তু কঙ্কি টলবার পাত্র নয়। তার একটা নীতিবোধ আছে না!

অবশ্য এই মেয়েটার বেলায় ব্যাপারটা বিলকুল আলাদা। মন-প্রাণ দিয়ে ভালোবেসে ফেলেছে ওকে। কিন্তু না…আগে নিজের ব্যাংক ব্যালেন্সটা ফুলেফেঁপে উঠুক, তারপর দেখা যাবে।

অনেক কষ্টে কথার মোড় ঘোরাল সে।

‘যাকগে, যা বলছিলাম—বড়লোক হতে আর দেরি নেই। একবার টাকাটা হাতে আসুক, জীবনেও আর ক্রিকেট ম্যাচ দেখতে আসব না। কিন্তু তুমি এখানে কী করছ? ক্রিকেট তো দুচোখে দেখতে পারো না।’

ঈষৎ হতাশার ছায়া পড়ল মেয়েটার মুখে। হয়তো অন্য কিছু শোনার আশা করছিল।

‘একটা কাজে এসেছি।’

‘অ্যাঁ? কী কাজ?’

মেয়েটি আঙুল তুলে দেখাল প্যাভিলিয়নের জিন্দালাশগুলোর দিকে। ওদিকে লর্ড প্লাম্পটন আর তাঁর বন্ধুটি ওজার-সমস্যার’ সমাধান করে ফের চোখের ওপর হ্যাট নামিয়ে চিতপটাং। নড়াচড়া নেই, দেখে মনেই হয় না প্রাণ আছে শরীরে।

‘কাল যখন এসেছিলাম, তখন ওই মড়াগুলোকে দেখে খুব মায়া হয়েছিল আমার। ভাবলাম, একটু খুঁচিয়ে চাঙা করা যায় কি না এদের।’

‘সন্দেহ আছে।’

‘আমারও। সবগুলো যেন বরফে রাখা মরা মাছ। তবু ভাবলাম, একবার চেষ্টা করে দেখি। কাল অবশ্য ইলাস্টিক আর গুলি ছিল না সাথে।’

‘ইলাস্টিক? গুলি?’

চোখ কপালে উঠে গেল কঙ্কির। পোশাকের ভেতর থেকে এক টুকরো শক্ত ইলাস্টিক আর একদলা টিনের ফয়েল বের করল মেয়েটা। ফয়েলটা পাকিয়ে গুলি বানিয়ে ইলাস্টিকের মাঝখানে বসিয়ে দাঁতে কামড়ে ধরল এক মাথা। তারপর ঘুরে লর্ড প্লাম্পটনের দিকে তাক করে নিখুঁত নিশানা করল।

দারুণ টিপ। কোনো ভুল হলো না। কঙ্কি মুগ্ধ নেত্রে সেই গোলার গতিপথ অনুসরণ করল। দেখল, চাচা হঠাৎ চমকে উঠে কানে হাত ডলছেন। গোলন্দাজের টিপ যে একেবারে মোক্ষম জায়গায় লেগেছে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই।

‘হায় খোদা!’ চেঁচিয়ে উঠল কঙ্কি। ‘ইয়ে, ইলাস্টিকটা এবার একটু আমাকে দেবে? স্কুলে থাকতে অনেক করেছি এ কাজ। দেখি, হাতটা এখনো চালু আছে কি না।’

মিনিট কয়েক পর পাশের বন্ধুর দিকে ফিরলেন লর্ড প্লাম্পটন।

‘এ বছর বোলতার উৎপাত খুব বেড়েছে,’ বললেন তিনি।

বন্ধুটি তখনো আধো ঘুমে। পিটপিট করে তাকিয়ে বললেন: ‘পলতা?’

‘বোলতা।’

‘হ্যাঁ, বোলতা।’

‘তা কী হয়েছে ওদের?’

‘বলছি, বেজায় বেড়েছে। এই তো একটু আগে একটা হুল ফোটাল কানে। আর এখন তো আরেকটা এসে হ্যাটটাই ফেলে দিল। অদ্ভুত কাণ্ড!’

এমন সময় ১৯১১ সালে সারের হয়ে খেলা এক লোক সেখানে এসে হাজির। তার গোঁফজোড়া দেখলেই সিন্ধুঘোটকের কথা মনে পড়ে যায়। লর্ড প্লাম্পটন বেশ খাতির করে সম্ভাষণ জানালেন লোকটাকে।

‘হাল্লো, ফ্রেডি?’

‘হাল্লো।’

‘ভালোই খেলা হচ্ছে।’

‘খাসা! দারুণ উত্তেজনা।’

‘তবে এই বোলতার উৎপাতটা বড্ড ভোগাচ্ছে।’

‘বোলতা?’

‘হ্যাঁ, বোলতা।’

‘কোন বোলতা?’

‘নাম জানি না। এই তো উড়ছে এখানে।’

‘এখানে কোনো বোলতা নেই।’

‘আছে।’

‘মেম্বারশিপ কার্ড ছাড়া লর্ডসের প্যাভিলিয়নে কারও ঢোকার অনুমতি নেই।’

‘আরে ভাই, এইমাত্র একটা এসে আমার হ্যাট ফেলে দিল। ওই দ্যাখো, জিমির হ্যাটও উড়ে গেল।’

মাথা নাড়ল সিন্ধুঘোটক। তারপর নিচু হয়ে মেঝের ওপর থেকে টিনের ফয়েলের দলাটা কুড়িয়ে নিল।

‘কেউ একজন গুলতি দিয়ে ছুড়ছে এসব। অনেক আগে আমিও এ কাজ করেছি। আহা! ধরেছি,’ ভুরু কুঁচকে তাকাল লোকটা। ‘ওই যে তিন শিলিংয়ের সিটে তোমার ভাইপো আর ওই মেয়েটা বসে আছে—ওখান থেকেই আসছে। ভালোমতো দেখো, মেয়েটা তোমার দিকেই টিপ লাগাচ্ছে।’

লর্ড প্লাম্পটন তাকালেন, চমকালেন এবং পাথরের মতো শক্ত হয়ে গেলেন।

‘আবার ওই মেয়ে! ইহকালে কি ওর হাত থেকে আমার রেহাই নেই? অ্যাটেনডেন্টদের ডাকো! সবাইকে হুকুম দাও, এক্ষুনি অ্যারেস্ট করে কমিটি রুমে ধরে আনুক ওকে।’

তারপরের ঘটনা অতি সংক্ষিপ্ত। কঙ্কি সবে ইলাস্টিকটা ঠোঁটের কাছে বাগিয়ে ধরে ফায়ারিংয়ের প্রস্তুতি নিচ্ছে, ঠিক তখনই তার কাঁধে পড়ল এক ভারী থাবা। পেছনে মেরিলিবোন ক্রিকেট ক্লাবের ইউনিফর্ম পরা এক অ্যাটেনডেন্ট, কড়া চেহারা। একই সময়ে আরেকখানা ভারী হাত পড়ল মেয়েটির কাঁধে। সেখানেও হাজির আরেক অ্যাটেনডেন্ট।

হাতে-নাতে ধরা পড়ে গেল ওরা।

মেরিলিবোন ক্রিকেট ক্লাবের কমিটি রুমটা বেশ গুরুগম্ভীর আর রাশভারী জায়গা। চারদিকের দেয়ালে ঝোলানো রয়েছে সাবেক আমলের সব নামজাদা ক্রিকেটারের ছবি—অধিকাংশেরই মুখভর্তি লম্বা দাড়ি। ছবিগুলো ওপর থেকে এমনভাবে তাকিয়ে থাকে, যেন জ্যান্ত মানুষকে ভর্ৎসনা করছে। যাদের বিবেকে সামান্যতম কালো দাগ আছে, তাদের মনে হবে ওই দাড়িওয়ালা বুজুর্গরা চোখ রাঙিয়ে শাসাচ্ছেন। যাদের বিবেক ধোয়া তুলসী পাতার মতো পরিষ্কার, তাদেরই কেবল এই পবিত্র ঘরে ঢুকতে বুক কাঁপে না। বাকিদের মনে হবে, এই বুঝি ঘাড় ধরে এমসিসির টাই খুলে নিয়ে তাদের সমাজচ্যুত ঘোষণা করা হলো।

বিশেষ করে প্রেসিডেন্ট যখন নিজে ডেস্কে বসে থাকেন, তখন ভয়টা আরও বাড়ে। লর্ড প্লাম্পটনের বিশেষ অনুরোধেই আজ এজলাসে বসেছেন তিনি। প্লাম্পটনের মতে, অপরাধের বহর যা, তার বিচার কোনো চুনোপুঁটির কাজ নয়—এর ফয়সালা একেবারে সর্বোচ্চ মহলেই হওয়া উচিত। সভার শুরুতেই সে কথা বললেন তিনি।

‘আমি চাই,’ হুঙ্কার ছাড়লেন লর্ড প্লাম্পটন, ‘এই বেয়াদবির এমন দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হোক, যা এমসিসির ইতিহাসে কেউ কখনো দেখেনি। আমাদের এই প্রাণের চেয়েও প্রিয় ক্লাবে…’ বলতে বলতে সম্মানের চোটে তিনি মাথা থেকে হ্যাটটা খুলতে গেলেন, কিন্তু মাঝপথে খেয়াল হলো—মাথায় তো হ্যাট নেই! তাই সামলে নিয়ে বললেন, ‘…মানে বলতে চাইছি, মেম্বারদের লক্ষ্য করে টিনের ফয়েলের দলা ছুড়ে মারা! ইয়ার্কি নাকি? মগের মুল্লুক পেয়েছে? যারা বিনা পয়সায় গ্যালারিতে বসে চিনেবাদাম চিবোয়—ফরাসিরা যাকে বলে ইতরজন—তাদের মারলেও একটা কথা ছিল। কিন্তু তাই বলে খোদ প্যাভিলিয়নের মেম্বারদের গায়ে হাত! আমরা যাচ্ছি কোথায়?’

একটু দম নিয়ে তিনি ফের শুরু করলেন: ‘আমার তো ইচ্ছে করছে মেয়েটার চামড়া তুলে নিতে। তবে আপনারা যদি সেটাকে একটু বেশি আদিম মনে করেন, তবে নিতান্ত দয়া দেখিয়ে বিশ বছরের সশ্রম কারাদণ্ডেই আমি রাজি। এই মেয়ে সমাজের জন্য এক ত্রাস! গাড়ি নিয়ে রাস্তায় দাপিয়ে বেড়ায়, এক হাতে পাবলিককে ধাক্কা দিয়ে চিতপটাং করে, আর অন্য হাতে তাদের হ্যাট উড়িয়ে দেয়। বাইবেলের কোন মহিলা যেন…ডেলাইলা? না, না…জিবে আসছিল নামটা… হ্যাঁ, জেজেবেল! এই মেয়ে মডার্ন যুগের জেজেবেল! এর পেটে পেটে শয়তানি।’

‘আঙ্কেল এভারার্ড,’ বলে উঠল কঙ্কি। ‘তুমি কিন্তু আমার ভালোবাসার নারীকে নিয়ে কথা বলছেন।’

মেয়েটি চমকে উঠল। ‘তাই নাকি?’

‘আলবত,’ জবাব দিল কঙ্কি। ‘আগেই বলা উচিত ছিল। কিন্তু তোমার নামটা জানা হয়নি তো…’

‘ক্ল্যারিসা। ক্ল্যারিসা বিনস্টেড।’

‘কয়টা “এস” আছে?’

‘বিনস্টেড-এরটা ধরলে মোট তিনটে।’

‘ক্ল্যারিসা, আমি তোমাকে ভালোবাসি। আমাকে বিয়ে করবে?’

‘নিশ্চয়!’ মেয়েটি চটপট জবাব দিল। ‘আমি তো ভাবছিলাম তুমি প্রস্তাবটা দিচ্ছ না কেন। আর এই সামান্য ব্যাপার নিয়ে এত হইচই কিসের, বুঝলাম না। আমেরিকায় তো বেসবল ম্যাচে আমরা হরহামেশাই সোডার বোতল ছুড়ে মারি।’

সারা ঘরে পিনপতন নীরবতা।

এমসিসির প্রেসিডেন্ট গলা খাঁকারি দিয়ে শুধালেন, ‘ম্যাডাম কি আমেরিকান?’

‘ষোলো আনা। “ওহ, সে ক্যান ইউ সি”… ধুর, জাতীয় সংগীত এর চেয়ে বেশি আর মনে থাকে না আমার। শিস দিয়ে শোনাব?’

লর্ড প্লাম্পটনকে একপাশে টেনে নিয়ে গেলেন প্রেসিডেন্ট। মুখটা থমথমে, চোখে দুশ্চিন্তা।

ফিসফিস করে বললেন, ‘এভারার্ড ভায়া, খুব হুঁশিয়ার! ব্যাপারটা খুব বুঝেশুনে সামলাতে হবে। আমি তো জানতাম না মেয়েটা আমেরিকান। কেউ আমাকে বলেওনি। এই মুহূর্তে আমরা কোনো আন্তর্জাতিক কেলেঙ্কারি ঘটাতে চাই না। বিশেষ করে যখন আমেরিকার গাঁট থেকে টাকাপয়সা খসানোর ধান্দায় আছি। তোমার অনুভূতিতে আঘাত লেগেছে, আমি বুঝতে পারছি…’

‘আর আমার আহত টপ হ্যাটটার কী হবে?’

‘ক্লাব তোমাকে একখানা আনকোরা নতুন হ্যাট কিনে দেবে। আর তারপর, আমার বিনীত অনুরোধ, এই চ্যাপ্টার এখানেই ক্লোজ করা হোক।’

‘তার মানে মেয়েটার চামড়াও তোলা যাবে না?’

‘না।’

‘বিশ বছরের জন্য জেলের ঘানিও টানানো যাবে না?’

‘উঁহু। ওসব করলে আন্তর্জাতিক কেলেঙ্কারি বেধে যাবে।’

লর্ড প্লাম্পটন গোমড়া মুখে বললেন ‘যা খুশি করো! তবে,’ তাঁর গলায় হঠাৎ খুশির ঝলক, ‘একটা কাজ আমি আলবত করতে পারি। এই যে আমার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা আবর্জনাটা—একে আমি সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত করতে পারি। এই যে!’ কঙ্কিকে ডাকলেন তিনি।

‘হাল্লো?’ বলল কঙ্কি

‘আজ থেকে তুই আর আমার ভাইপো না।’

‘যাক, বাঁচলাম,’ বলল কঙ্কি।

কমিটি রুম থেকে বেরোতেই এক অ্যাটেনডেন্ট জানাল, টেলিফোনে এক ভদ্রলোক কঙ্কির তলব করেছেন। ক্ল্যারিসাকে নিচে অপেক্ষা করতে বলে ফোন ধরতে গেল কঙ্কি। মিনিট দুয়েক ওপাশে কান পেতে যা শুনল, তাতে ফোন রেখে সে যখন ফিরল, তখন ওর চোখ কোটর থেকে ঠিকরে বেরিয়ে পড়ার জোগাড় আর চোয়াল ঝুলে পড়েছে হাঁটুর কাছে।

‘শোনো, একটু আগে যে তোমাকে বিয়ের প্রস্তাব দিলাম, মনে আছে?’ ক্ল্যারিসাকে বলল ও।

‘আছে।’

‘তুমিও রাজি হয়েছিলে।’

‘হয়েছিলাম।’

‘তা প্রস্তাবটা ওই পর্যন্তই থাক। কারণ, বিয়েটা হচ্ছে না। ম্যাকস্পোরান ফোন করেছিল। ব্যাটা বলছে তার হিসাবনিকাশে ভুল হয়েছে, আমার ওই দশ পাউন্ডে সমুদ্রের পানি থেকে সোনা তোলার প্রজেক্ট চালু করা যাবে না। ওর আরও ত্রিশ হাজার পাউন্ড চাই। আমি বললাম, “নেই।” ও বলল, “ব্যাড লাক।” আমি বললাম, “আমার দশ পাউন্ড ফেরত দাও।” ও বলল, “ফেরত পাবে না।” ব্যস! আমি এখন কপর্দকশূন্য। তোমাকে বিয়ে করা সম্ভব নয়।’

কপালে ভাঁজ পড়ল ক্ল্যারিসার।

‘সমস্যাটা কোথায় বুঝলাম না। বাবার তো টাকার পাহাড় আছে। ওনার টাকাতেই সংসার চলবে।’

‘উঁহু, সেটা হবে না। আমি প্রতিজ্ঞা করেছি, টাকার লোভে কোনো মেয়েকে বিয়ে করব না।’

‘তুমি তো টাকার লোভে করছ না, করছ আমাকে ভালোবেসে। আমরা যে সোলমেট!’

‘তা ঠিক। কিন্তু তোমার আছে অঢেল, আর আমার পকেটে ফুটো পয়সাও নেই।’

‘ধরো, তোমার যদি একটা চাকরি থাকত?’

‘আহা! যদি থাকত!’

‘ব্যস, তবেই তো ল্যাঠা চুগে গেল। আমার বাবার বিশাল ব্যবসা আছে, সেখানে আরেকজন ভাইস প্রেসিডেন্টের চেয়ার খালি করা ওনার জন্য বাঁ হাতের খেল।’

‘ভাইস প্রেসিডেন্ট?’

‘হ্যাঁ।’

‘কিন্তু ভাইস প্রেসিডেন্ট হওয়ার মতো জ্ঞানবুদ্ধি তো আমার নেই।’

‘ভাইস প্রেসিডেন্ট পদে থাকার জন্য কিছু জানার দরকার নেই। তোমার কাজ হবে শুধু কনফারেন্সে গিয়ে বসে থাকা, আর বাবা যখনই কোনো প্রস্তাব দেবেন, তখন শুধু বলবে—”ইয়েস”।’

‘এত লোকের সামনে কথা বলতে হবে?’

‘আচ্ছা, কথা না হয় নাই বললে, শুধু মাথাটা দোলালেই চলবে।’

‘ওহ, মাথা দোলাতে বলো? তা পারব।’

‘তাহলে আর কথা কী! এসো, একটা চুমু দাও।’

দীর্ঘ, আবেশমাখা চুম্বনে মিলল ওদের ঠোঁট। সেই গভীর আলিঙ্গন থেকে যখন কঙ্কি ছাড়া পেল, তখন তার চোখ চকচক করছে, গালে খুশির আভা। আকাশের দিকে হাত তুলে সে চেঁচিয়ে উঠল:

‘হাউজ দ্যাট, আম্পায়ার?’

‘জলি গুড শো, স্যার,’ জবাব দিল ক্ল্যারিসা।