এটা মিচিকো চাকমার গল্প
ছোট্ট একটা শহরে সারা দিন আপনাকে খুঁজে পেতে ব্যর্থ হলাম আমরা। সন্ধ্যায় হোটেলে ফিরে আসি। রাতে হোটেল ম্যানেজার আমাদের কামরায় এসে হাজির। তিনি জানান, দুজন লোক এসেছিল আমাদের সন্ধানে। মনে হলো, অন্য আরেক ঝামেলায় ফেঁসে গেলাম আমরা।
এটা মিচিকো চাকমার গল্প
ছোট্ট একটা শহরে সারা দিন আপনাকে খুঁজে পেতে ব্যর্থ হলাম আমরা। সন্ধ্যায় হোটেলে ফিরে আসি। রাতে হোটেল ম্যানেজার আমাদের কামরায় এসে হাজির। তিনি জানান, দুজন লোক এসেছিল আমাদের সন্ধানে। মনে হলো, অন্য আরেক ঝামেলায় ফেঁসে গেলাম আমরা।
দিদি,
বড় বোন মাহবুবা পাঠান একবার ক্যালিফোর্নিয়া থেকে ঢাকায় এলেন। একদিন গল্প হচ্ছিল পাহাড়-জঙ্গল নিয়ে। তিনি আমাকে আপনার কথা বললেন। তখন আমার নিয়মিত যাতায়াত পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন অঞ্চলে। বড় বোন আমাকে আপনার সন্ধান এনে দিতে বললেন। সেই সঙ্গে আপনার সম্পর্কিত বিস্তারিত তুলে ধরতে লাগলেন।
আশির দশকের শুরুতে আপনি রাঙামাটির কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক শ্রেণিতে ভর্তি হয়েছিলেন। ব্যবস্থাপনা বিভাগের সব ছাত্র-ছাত্রী প্রথমে আপনাকে একটু ভিন্ন দৃষ্টিতে দেখতেন। আসলে এমনটা হওয়াই স্বাভাবিক। ভিন্ন রক্তবাহী, ভিন্নভাষী, ভিন্ন চেহারা কিংবা ভিন্ন খাদ্যাভাসের একজন মানুষকে সকলের পক্ষে সহজভাবে মেনে নেওয়া সম্ভব নয়। তাই নানা সময় আপনাকে তীর্যক আক্রমণের শিকার হতে হয়েছিল।
একবার আপনার এক সহপাঠী যুবক বলে উঠেছিলেন, ‘তোমরা তো চাকমা, শুনেছি শুধু সাপ-ব্যাঙ খাও’। আপনি সেদিন ভীষণ কষ্ট পেয়েছিলেন মনে। তবে আপনার সেই কষ্ট বেশি দিন স্থায়ী হয়নি। কয়েকজন সহপাঠিনী অল্প সময়ের মধ্যে আপনাকে খুবই আপন করে নেন। তারা সব সময় আপনাকে আগলে রাখতেন। তারা জানতেন, আপনি অরণ্যরানি, ঝরনাজলে স্নাত হয়ে বড় হয়েছেন, পাহাড় ছিল ঘর, সঙ্গী ছিল বুনো হরিণী কিংবা পাহাড়ি চাতক; এই শহরে একেবারেই নতুন। তাই তাদের সমস্ত মায়া ছিল শুধু আপনারই জন্য। আর আপনি নিজেও আপনার আচরণ আর ভালোবাসা দিয়ে তাদর মন জয় করেছিলেন।
ক্যাম্পাসের ব্যস্ত সময়ের মধ্যেও আপনার মনটি পড়ে থাকত রাঙামাটির একজনের মনে; রাজপরিবারের যুবক পাও পাও চাকমা। সেই শৈশব থেকে আপনারা একে অপরকে ভালোবাসতেন। পাও পাও খুব সুন্দর গান গাইতে পারেন, তিনি যখন সুর ধরেন, কাসালং নদী তখন যেন জোয়ারে ভেসে যায়। আর আপনার মনে নিয়তই নিজের অজান্তে বেজে ওঠে তার গান।
অনার্স ফাইনাল পরীক্ষার মাস দুয়েক আগে এক মর্ম বেদনাময় খবর এসে পৌঁছায় আপনার কাছে, পাহাড়ি পথে চলতে গিয়ে বাইক অ্যাক্সিডেন্ট করেছেন পাও পাও। আপনি তৎক্ষণাৎ ছুটে যান রাঙামাটিতে। সেখানে গিয়ে জানতে পারেন, পাও পাও আর কোনো দিন হাঁটতে পারবেন না। বাইক অ্যাক্সিডেন্টের আঘাতের ফলে তার কোমর থেকে নিচের অংশ অবশ হয়ে গিয়েছে। আপনার পৃথিবী অন্ধকার হয়ে এল, বেমালুম ভুলে গেলেন ফাইনাল পরীক্ষার কথা। এদিকে আপনার কয়েকজন সহপাঠী ছুটে আসেন রাঙামাটিতে। এরপর তাঁরা প্রায় জোর করেই আপনাকে ঢাকায় নিয়ে আসেন।
একসময় পরীক্ষা শেষ হয়, আপনি রাঙামাটি ফিরে এসে সেই অর্ধাঙ্গ বিবস পাও পাওকে বিয়ে করেন। আপনার সহপাঠিনীরা বারবার আপনাকে এ কাজ করতে বারণ করেছিলেন। তবুও আপনি ভালোবাসার মানুষটির সঙ্গেই বাকি জীবনটা কাটানোর সিদ্ধান্তে অটল ছিলেন।
বিয়ের পর পাও পাও সারাটা দিন হুইলচেয়ারে বসে থাকতেন, আপনি সংসার সামলাতেন। আরেকটা বিষয় খুবই বেদনাময়, রাজপরিবারের লোকজন পাও পাওয়ের সঙ্গে আপনার বিয়ে মন থেকে মেনে নিতে পারেনি। দিনের পর দিন তারা আপনার সঙ্গে নিদারুণ খারাপ ব্যবহার করে গেছে। এরপর আপনি রাঙামাটির ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশনের একটি চাকরিতে যোগদান করেন। কিন্তু একদিকে পঙ্গু স্বামীর অসহায়ত্ব আর অন্যদিকে শ্বশুরবাড়ির মানুষদের নিদারুণ দুর্ব্যবহারে আপনার জীবন অতিষ্ঠ হয়ে ওঠে।
প্রিয় মিচিকো চাকমা,
প্রায় ২৫ বছর আগের এসব কথা বলতে বলতে আমার বড় বোন কেঁদে উঠে বলেছিলেন, ‘মিচিকো পুরোপুরি পাগল হয়ে গেছে। শুনেছি এখন সে রাঙামাটি শহরের রাস্তায় রাস্তায় আর বাজারে ঘুরে বেড়ায়।’ আপনার গল্পের এই অংশ শোনার পর আমার শরীর শিহরিত হয়ে ওঠে, আর একই সঙ্গে আপনাকে দেখার এক অদম্য ইচ্ছা জেগে উঠেছিল মনে।
২০০৬ সালের অক্টোবরের ২৭ তারিখ জঙ্গল প্রিয় ছোট ভাই ইশতিয়াক হাসানকে নিয়ে হাজির হই রাঙামাটি শহরে। রিজার্ভ বাজারের একটি হোটেলে বুকিং দিয়ে জিনিসপত্র রেখে বেরিয়ে আসি আপনার সন্ধানে। রাস্তায় কিংবা বাজারে যাকে দেখলাম, তাকেই জিজ্ঞেস করলাম আপনার কথা। এখানে একটা জিনিস খেয়াল করলাম। বাঙালিদের একটা কথা জিজ্ঞেস করলে সাত কথায় উত্তর দেয়। কিন্তু এরা খুবই শান্ত, প্রকৃতির মতো নীরব। মুখ দেখে এদের ভেতরটা বোঝা একেবারেই অসম্ভব। আমাদের প্রশ্নের উত্তরে অনেকেই নীরব রইল, কেউ কেউ বলল ‘জানা নেই’।
ছোট্ট একটা শহরে সারা দিন আপনাকে খুঁজে পেতে ব্যর্থ হলাম আমরা। সন্ধ্যায় হোটেলে ফিরে আসি। রাতে হোটেল ম্যানেজার আমাদের কামরায় এসে হাজির। তিনি জানান, দুজন লোক এসেছিল আমাদের সন্ধানে। মনে হলো, অন্য আরেক ঝামেলায় ফেঁসে গেলাম আমরা। পাহাড় তখনো উত্তপ্ত। শান্তি বাহিনী বিলুপ্ত হয়ে গেলেও ইউপিডিএফ আর জেএসএস সদা তৎপর। পার্বত্য চট্টগ্রামের জেলা এবং থানা সদরগুলোতে বাংলাদেশি গোয়েন্দারা যেমন তৎপর, পাহাড়ি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো একই রকম সজাগ সেখানে। সারা দিন ধরে একজন মানুষের সন্ধান করায় আমরা তাদের নজরে পড়ে গেছি। যাক হোটেল ম্যানেজার আমাদের কথা তাদের বলেননি। তবে সকালবেলা হোটেল ছেড়ে দিতে বললেন।
দিদি,
আসলে তখন খুব ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম। তবু হাল ছাড়িনি, আপনাকে দেখার এক অদম্য ইচ্ছা চেপে বসেছিল মনে। নতুন একটা হোটেলে এসে আশ্রয় নিই। তারপর সাবধানে আপনার সন্ধান করতে থাকি। এভাবেই খুঁজতে খুঁজতে পরের দিন বিকেলে একজনের কাছে জানতে পারি, আপনার বাসা তবলছড়িতে। আমরা দ্রুত তবলছড়ি মোড়ে এসে হাজির হই। সেখানে একটি দোকানে জিজ্ঞেস করতেই, একজন চাকমা মহিলা আমার পরিচয় জিজ্ঞেস করল, নিজের পরিচয় দেওয়ার পাশাপাশি, বড় বোনের প্রিয় সহপাঠিনীকে খুঁজে পাওয়ার ইচ্ছাটাও জানালাম তাকে। তিনি বিষয়টা বুঝতে পেরে আমাদের আপনার ঠিকানা দিয়ে দিলেন।
তবলছড়ির মূল সড়ক থেকে কিছুটা ভেতরে হেঁটে যাওয়ার পর টিনের বেড়া দেওয়া একটি ছোট্ট বাড়ির সামনে এসে আমরা থামলাম। এই বাড়ির কথাই আমাদের বলা হয়েছিল। ভেতরে প্রবেশ করতেই পরিপাটি পোশাকের একজন মধ্যবয়স্ক ভদ্রলোককে দেখা গেল। আপনার কথা জিজ্ঞেস করতেই তিনি আমাদের পরিচয় জানতে চাইলেন। আমি যখন তাকে বলছিলাম, আপনি আমার বড় বোনের সাথে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় লেখাপড়া করতেন, ঠিক সেই মুহূর্তে আপনি ঘরের বাইরে এসে দাঁড়ালেন। বিকেলের সোনা রোদ পড়ছিল আপনার শরীরে। তাতে ঝলমল করছিল আপনার সিল্কের শাড়ি। আমি যেন স্তব্ধ হয়ে গেলাম। আমি ভেবেছিলাম আপনাকে চাকমাদের ঐতিহ্যবাহী পোশাক পিনন এবং খাদি পরনে দেখতে পাব। এমনকি রাঙামাটি শহরের কোথাও আমি কোনো চাকমা নারীকে শাড়ি পরতে দেখিনি। প্রথমে গভীর দৃষ্টিতে আপনি আমার দিকে তাকিয়ে ছিলেন। আমি বড় বোনের একটি ছবি সঙ্গে করে নিয়েছিলাম। সেটি আপনার সামনে তুলে ধরতেই হাসিতে উদ্ভাসিত হয়ে উঠল মুখটি। পরক্ষণেই জলের ধারা গড়িয়ে পড়ল দুচোখ বেয়ে। নিশ্চয়ই ২৫ বছর আগের অনেক কথা মনে পড়ে গিয়েছিল আপনার। সেই সহপাঠিনীদের সঙ্গে আপনার সম্পর্ক এতটাই গভীর ছিল, এখনো আপনি নিয়মিত তাদের সংস্কৃতির শাড়ি পরিধান করে থাকেন। আমি আপনাকে কথা বলানোর অনেক চেষ্টা করেছিলাম দিদি, কিন্তু আপনি কিছুই বলেননি, শুধু ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে ছিলেন, আর আমার ভেতরটা চুরমার হয়ে যাচ্ছিল।
বাড়িতে যে ভদ্রলোক উপস্থিত ছিলেন, তিনি আপনার ভাই, ডা. টলস্টয় চাকমা। তিনি জানিয়েছিলেন, অনেক চিকিৎসা করেও আপনার অবস্থার উন্নতি করা যায়নি। প্রায় সময়ই আপনি বাড়ি থেকে নানান জায়গায় চলে যান। আসলে আমিও জানতাম, আপনার অসুখটা কখনোই পুরোপুরি সুস্থ হওয়ার নয় দিদি। এর নাম ‘সিজোফ্রেনিয়া’; ল্যাটিন শব্দ ‘সিজো’ যার অর্থ মন আর ‘ফেনিয়া’ শব্দের অর্থ হচ্ছে ভেঙে যাওয়া। আপনার যে মন ভেঙে গিয়েছিল দিদি, মন ভাঙলে তা কি সহজে আর জোড়া লাগে। আপনার সঙ্গে সাক্ষাতের সেই সময়টাতে এক গভীর অনুভ’তি যেন এক অন্য জগতে টেনে নিয়েছিল আমাকে। যাক, বিদায় বেলায় আমি আপনাকে বলেছিলাম, আগামী বছর বড় বোনকে নিয়ে অবশ্যই আপনার কাছে আসব।
পরের বছর বড় বোন দেশে এলে আমি তাকে আপনার ওখানে নিয়ে যাই। দীর্ঘ সময় পর আপনাদের সেই সাক্ষাতের সময়টুকু আমার কাছে সারাটা জীবন হিরন্ময় সময় হয়ে থাকবে। আপনি সেই পুরোনো সহপাঠিনীকে সহজেই চিনতে পেরেছিলেন। গভীর আবেগে দুজন দুজনকে জড়িয়ে রেখেছিলেন অনেকক্ষণ। তবে গোটা সময়টাতে আপনার কথাবার্তা ছিল অসংলগ্ন। এমনটা হওয়ারই কথা দিদি, আসলে আপনি তো আর নিজের মধ্যে ছিলেন না।
দিদি, একটা সময় যখনই আমি পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন অঞ্চল পরিভ্রমণ করেছি, আমার মনের মধ্যে থাকত কল্পনা চাকমার নাম। আপনার সঙ্গে পরিচিত হওয়ার পর থেকে দ্বিতীয় আরেকটি নাম যোগ হয়েছিল। আর যেখানেই থাকতাম, প্রায় সময় আপনার কথা মনে হতো। তাই একবার যখন বান্দরবানে মুরংদের নিয়ে একটি ডকুমেন্টারি তৈরি করছিলাম, তখন হঠাৎই আপনার কথা মনে হয়ে গেল। খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি, বান্দরবান-তিন জেলার সংযোগকারী মূল সড়কটি ধরে তবলছড়ি যেতে খুব বেশি সময় লাগল না। সেখানে পৌঁছেই দুঃসংবাদটি জানতে পারলাম, এই পাহাড় ভূমি ছেড়ে আপনি চলে গেছেন ওই দূর আকাশে। ভীষণ ভারাক্রান্ত মন নিয়ে ফিরে এলাম বান্দরবানে।
হারিয়ে যাওয়া পাহাড়কন্যা, আমাকে ক্ষমা করবেন। আপনার কাহিনি আরও অনেক আগেই লিপিবদ্ধ করার কথা ছিল। বৈষয়িক নানা কারণে তা হয়ে ওঠেনি। আর তাই বরাবরই মনের ভেতর একটা খচখচানি কাজ করত। আজ তা থেকে মুক্তি পেলাম। আপনি ভালো থাকুন আকাশের ওপারে আকাশে; সম্পূর্ণ সুস্থ এক পাও পাও চাকমাকে নিয়ে। শুনেছি ওখানে বৈষম্য নেই, আপনাদের পরজীবন সুখী হোক।