পাপা আর আমি

আমার বয়স এখন বিশের কোঠায়। তেমন বেশি বয়স একে আসলে বলাও যায় না। আবার এটাও বলা যায়, সুস্থ-সবলভাবে জীবনযাপন করলে মোটামুটি পুরো জীবনের পাঁচ ভাগের এক ভাগ শেষ। পাঁচ ভাগের এক ভাগের এই ক্ষুদ্র জীবনে খুব কম মানুষকেই কাছে থেকে দেখার সৌভাগ্য হয়েছে। আজকের এই বিশেষ দিনে তাই ভাবলাম, আমার জীবনের এই অধ্যায়ের অন্যতম প্রধান চরিত্র, আমার বাবাকে নিয়েই লিখি।

Papa and I

আমি আবার তেমন ভাবগাম্ভীর্যপূর্ণ লেখা খুব একটা লিখতে পারি না। মাথায় যা আসে, সেটাকেই একটু গুছিয়ে লিখতে পারলে অনেক মনে হয়।

আমার বাবার কোনো এক বিশেষ শখের কারণে আমাকে বাবাকে ‘পাপা’ ডাকা শিখানো হয়েছে। এটা নিয়ে এখনো বন্ধুমহলে হাসির পাত্র হই। খারাপ লাগে না।

পাপাকে নিয়ে আমার ছোটবেলার স্মৃতি খুবই কম। তবে কিছু স্মৃতি আছে, যেগুলো ডিজিক্যামের ছবির মতো আবছা আর মায়ামাখা। কয়েকটা লেখার চেষ্টা করি।

অনেক ছোটবেলায়, ২০০৮-০৯ সালের দিকে হবে হয়তো, তখন লোডশেডিং হতো অনেক। তখন অবশ্য এখনকার মতো এত গরম থাকত না। আমাদের বাসায় তখন একটা মোটামুটি মাঝারি সাইজের রেডিও ছিল। সন্ধ্যার সময় কারেন্ট চলে গেলে আমি আর পাপা বারান্দায় বসে রেডিও শুনতাম। কত ধরনের জিনিস যে শুনতাম আমরা! তখন “স্লামডগ মিলিয়নিয়ার” মুভির গান সারাদিন রেডিওতে বাজত। আর বাজত রেডিও ফুর্তিতে ফুয়াদের বিভিন্ন গান। পাপার কাজ ছিল রেডিও বাজিয়ে চুপচাপ গম্ভীর হয়ে বসে থাকা, ক্ষেত্রবিশেষে গুনগুন করে গানের সঙ্গে সুর মেলানো, আর আমার কাজ ছিল বানরের মতো বারান্দার রেলিং ধরে ঝুলাঝুলি করা।

ওই সময়ের দিকেই আমরা নন্দন মেগা শপে নিজেদের মাসিক বা ঈদের বাজার করতে যেতাম। আমার মনে আছে, ওই সময় আমি এত জ্বালাতাম যে একসময় আর হাঁটতে চাইতাম না। তখন আমাকে ট্রলিতে করে ঠেলে ঠেলে পুরো বাজার করতে হতো। ছোটবেলার সেই কথা মনে করলে এখনো মনে হয়, কত বড় মনে হতো সেই জায়গাটা। তবে এর সঙ্গে আরও একটা মজার জিনিস মনে পড়ে। আমাদের শপিং করা শেষ হলে পাপা সবসময় এক প্যাকেট চুইংগাম কিনে গাড়িতে আসত, আর আমরা বাপ-বেটি একসঙ্গে সেই চুইংগাম খেতে খেতে বাসায় আসতাম।

আরেকটু বড় হওয়ার পর পাপা আমাকে স্কুলে নিয়ে যেত প্রতিদিন। পাপার আগে ঘুম থেকে উঠে যাওয়ার অভ্যাসের কারণে আমার বেশ আগেই স্কুলে যেতে হতো। মাঝেমধ্যে এমন হতো, স্কুলের গেটই খুলত না, তার আগেই আমরা স্কুলের সামনে হাজির। তখন আমরা দুজন মিলে স্কুলের আশেপাশে হেঁটে বেড়াতাম। পাপা আমাকে বিভিন্ন গাছ চিনানোর চেষ্টা করত, আর আমি লক্ষ্মীটির মতো আগের দিন শেখানো গাছের নাম পরের দিনই ভুলে বসে থাকতাম। পাপা হাল ছাড়ত না। আবার নতুন করে গাছের নাম বলত, আমি আবার শুনতাম, শিখতাম।

আমি যখন আরও একটু বড় হলাম, তখন আমাকে রাস্তা চিনানোর একের পর এক ব্যর্থ চেষ্টা চালিয়েও পাপা ক্ষান্ত হয়নি। “আমি যখন স্টুডেন্ট ছিলাম, তখন এখানে এসে আড্ডা দিতাম,” কিংবা, “আমি যখন মাত্র ভার্সিটিতে উঠলাম, তখন তো এসব ছিল না, অনেক খোলামেলা জায়গা ছিল” – এসব শুনতে শুনতে একেকটা রাস্তা চিনানো হতো আমাকে। যার কারণে, রাস্তার চেয়ে গল্পই বেশি মনে থাকত আমার।

এইচএসসি দেওয়ার পর আমি একটা গিটার উপহার হিসেবে পেয়েছিলাম, কালো রঙের, আমার জীবনের প্রথম গিটার। সারাদিন এই গিটার নিয়ে মহা উৎসাহে ট্যাং ট্যাং করতাম। একদিন পাপা এসে বলল, “দেখি, তোর গিটারটা দে তো।” দিলাম। অবাক হয়ে দেখলাম, গিটার প্রথম ধাক্কাতেই ঠিক করে ধরতে পারল। জিজ্ঞেস করলাম, “গিটার বাজাতে পারো তুমি?” খালি হেসেই গেল, কোনো উত্তর দিল না। আমার হাতে গিটার ধরিয়ে দিয়ে বলল, “কিছু একটা শিখে আমাকে শুনাবে কোনোদিন।” সেই শেখা এখনো হয়নি, কিন্তু পাপার সেই হাসিটা মনে আছে।

আমার ভর্তি পরীক্ষার সময়কার কথা। এখন যখন ভর্তি পরীক্ষার সময়টা দেখি, আমি আসলেই জানি না আমি কী বা কোথায় পড়তে চেয়েছিলাম। কিন্তু আমার বাবা-মা সবসময় চেয়েছিলেন আমি যেন একটু খুশি থাকি। 

মেডিক্যালের ভর্তি পরীক্ষার সময় আমি কিচ্ছু পড়িনি বললেই হয়। শুরু থেকেই ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের প্রিপারেশন নিচ্ছিলাম। তাই পরীক্ষার আগের দুই দিনে বেশ কয়েকটা প্রশ্নব্যাংক নিয়ে দুই মিনিট পরপর, “আরও আগে পড়া উচিত ছিল,” বলতে বলতেই সময় শেষ। মেডিক্যালের ভর্তি পরীক্ষার দিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সিট পড়েছিল। কিচ্ছু পারি না, দুরুদুরু বুকে পরীক্ষা দিতে গেলাম। পরীক্ষার হলে পাঠানোর আগে পাপা যত ধরনের দোয়া সম্ভব, সব পড়ে ফুঁ দিয়ে বলল, “যা হবে, ভালো হবে। পাপা দোয়া করে দিলাম।” পরীক্ষা যা-তা দিলাম। শেষ মুহূর্তে মোটামুটি ২০ নম্বরের মতো প্রশ্ন মনের মাধুরী মিশিয়ে দাগিয়ে আসলাম। পরীক্ষার হল থেকে বের হওয়ার পর পাপাকে কোনো মতে খুঁজে বের করলাম, আর বললাম, “হবে না।” নানাভাবে বোঝানোর চেষ্টা করল, “হবে, সমস্যা নাই। আরে, বেশি ভাবতে হয় না।” শেষমেশ হাল ছেড়ে দিয়ে বলল, “চল, আমার হল ঘুরে দেখাই।”

সেদিন হলের মাঝের রাস্তা দিয়ে অনেক ঘুরে-টুরে, ঢাবি-বুয়েট হয়ে বাসায় আসলাম। যা হয়, আমি রাস্তা ওভাবে চিনে শেষ করতে পারি না। এখন মনে হয়, পাপা আসলে ভালোই চেষ্টা করেছিল যাতে আমি পরীক্ষার পরের ধাক্কাটা সামাল দিয়ে উঠতে পারি। একেকজনের সান্ত্বনা দেওয়ার ধরন একেকরকম। পাপার ছিল ঘুরে ঘুরে গল্প বলে আমার মন হালকা করা।

এরকম করে কত দিনের কত গল্প জমে আছে। পাপা এখনো খাবার টেবিলে বসে গল্প করেন, আর আমি শুনি। মাঝে মাঝে মনে হয়, বারান্দায় বসে রেডিও শোনার দিনগুলো খুব বেশি পুরোনো নয়… শুধু আমি আরেকটু বড় হয়ে গেছি।

আমি এখনো রাস্তা ঠিকমতো চিনতে পারি না, গাছের নামও ভুলে যাই। কিন্তু পাপার কাছ থেকে শোনা গল্পগুলো ভুলে যাই না। হয়তো সেগুলোই আমাকে বড় করেছে, সাহস দিয়েছে, আর অজান্তেই শিখিয়েছে কীভাবে মানুষ হতে হয়।

আমার জীবনে যত শিক্ষক, যত বন্ধু, যত বই এসেছে, তাদের সবার আগেই একজন মানুষ ধৈর্য ধরে আমাকে পৃথিবীটা চিনিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। কখনো রেডিও শুনতে শুনতে, কখনো স্কুলের পথে হাঁটতে হাঁটতে, কখনো কোনো পরীক্ষার পর মন খারাপের দিনে গল্প বলতে বলতে।

বাবা দিবসের শুভেচ্ছা, পাপা।

গিটারটা এখনো ঠিকমতো শেখা হয়নি। তবে কোনো একদিন, সত্যিই কিছু একটা শিখে তোমাকে শুনাব।