সুতায় বোনা জীবনের গল্প
৭০-এর দশকের শুরুতে বাংলাদেশে শিল্পকে পেশা হিসেবে বেছে নেওয়া ছিল প্রায় অসম্ভব। সদ্য স্বাধীন দেশ গঠনের কাজে ব্যস্ত; সমাজের কাছে গ্রহণযোগ্য পেশা বলতে ছিল চিকিৎসা বা প্রকৌশল।
সুতায় বোনা জীবনের গল্প
৭০-এর দশকের শুরুতে বাংলাদেশে শিল্পকে পেশা হিসেবে বেছে নেওয়া ছিল প্রায় অসম্ভব। সদ্য স্বাধীন দেশ গঠনের কাজে ব্যস্ত; সমাজের কাছে গ্রহণযোগ্য পেশা বলতে ছিল চিকিৎসা বা প্রকৌশল।
চন্দ্র শেখর সাহা তখন চতুর্থ শ্রেণিতে পড়েন। স্কুলের চিত্রাঙ্কন পরীক্ষায় তিনি ফেল করেন। পরীক্ষার জন্য বাবার কাছে জলরং চেয়েছিলেন, বাবা কিনেও দিয়েছিলেন। ছোট্ট শেখর মনোযোগ দিয়ে ছবি রং করেছিলেন, ভেবেছিলেন এবার শিক্ষক নিশ্চয়ই মুগ্ধ হবেন। কিন্তু রং শুকায়নি—ফলে ছবিটি দাগ পড়া ও অস্পষ্ট হয়ে যায়।
যখন স্কুল থেকে শেখরের বাবাকে ডাকা হলো, তিনি আশা করেছিলেন ছেলের প্রতিভা দেখবেন—কিন্তু সামনে রাখা ছিল একটি দাগ লাগা ছবি আর বড় লাল পাতাজুড়ে ‘এফ’ দেওয়া।
তবে সেই শিশুটিই বড় হয়ে দেশের টেক্সটাইল ডিজাইনের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় রচনা করেছে। কারুশিল্প, নকশা ও ঐতিহ্যের বিস্মৃত গল্পগুলো আবার তুলে এনেছেন আলোয়।
চট্টগ্রামে জন্ম নেওয়া সাহা এমন এক পরিবারে বড় হয়েছেন, যেখানে শৃঙ্খলা এবং শিক্ষাকে সবচেয়ে গুরুত্ব দেওয়া হতো। কিন্তু তাঁর মন পড়ে থাকত শিল্পের জগতে। তিনি বলেন, “পড়াশোনায় খুব ভালো ছিলাম না, কিন্তু স্কুলে যেতে দারুণ ভালো লাগত। বিরিয়ানি আর সিনেমার টিকিটের বিনিময়ে আমার ৩২ জন সহপাঠীর জন্য বায়োলজির ডায়াগ্রাম আঁকতাম। নিজের ডায়াগ্রামটা আঁকতে হতো শেষে।”
চট্টগ্রাম কলেজিয়েট স্কুল, পরে চট্টগ্রাম কলেজ—শেখর পাঠ্যবইয়ের বাইরেই ছন্দ খুঁজে পেয়েছিলেন। নাটক নির্দেশনা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের সূচি ঠিক করা, ফিল্ড ট্রিপ আয়োজন—সর্বত্র তিনি ছিলেন নেতৃত্বে। নম্বর কম থাকলেও তাঁর প্রাণশক্তির কারণে শিক্ষকেরা তাঁকে পছন্দ করতেন। তিনি বলেন, “কোনো অনুষ্ঠানই আমাকে ছাড়া হতো না। এখন ভাবলে মনে হয়, ওই সময় থেকেই আমার ডিজাইনের প্রবৃত্তি তৈরি হয়েছিল।”
৭০-এর দশকের শুরুতে বাংলাদেশে শিল্পকে পেশা হিসেবে বেছে নেওয়া ছিল প্রায় অসম্ভব। সদ্য স্বাধীন দেশ গঠনের কাজে ব্যস্ত; সমাজের কাছে গ্রহণযোগ্য পেশা বলতে ছিল চিকিৎসা বা প্রকৌশল। সাহা বলেন, “বাবাকে বলতে ভয় পাচ্ছিলাম, আমি আর্ট স্কুলে ভর্তি হতে চাই। যখন বললাম, তিনি খুশি হননি। তবে আমার রেজাল্ট দেখে তিনি ভাবলেন—এটাই হয়তো আমার জন্য ভালো।”
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ থেকে ১৯৮০ সালে তিনি স্নাতক সম্পন্ন করেন। একই বছর তাঁর জীবনে আসে বড় বাঁক। ব্র্যাকে কর্মরত বন্ধু অনীশ বড়ুয়া জানান নতুন এক হ্যান্ডিক্রাফট উদ্যোগ—’আড়ং’-এর কথা। তিনি আবেদন করেন এবং প্রতিষ্ঠাতা আয়েশা আবেদের কাছে সাক্ষাৎকার দেন। ‘সাক্ষাৎকার শেষে আয়েশা আবেদ বললেন, আগামীকাল থেকেই যোগ দিন। এভাবেই পথচলা শুরু,’ স্মরণ করেন তিনি।
ডিজাইনার হিসেবে শুরু করে পরবর্তী দুই দশকে সাহা হয়ে ওঠেন আড়ংয়ের সৃজনশীল বিবর্তনের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। বাংলাদেশি কারুশিল্প নিয়ে গবেষণা ও পুনরাবিষ্কারে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। তিনি বলেন, “আড়ং আর আমি একসঙ্গেই বেড়ে উঠেছি। যেদিন ১০ হাজার টাকার পণ্য বিক্রি উদযাপন করতাম, সেদিন থেকে আজকের কোটি টাকার যাত্রা—সবই চোখের সামনে দেখেছি।”
সংখ্যা তাঁর কাছে কখনও প্রকৃত মাপকাঠি ছিল না। তাঁর কাছে গুরুত্বপূর্ণ ছিল সৃজনশীলতার স্বাধীনতা। তিনি বলেন, “আড়ংয়ের প্রতি আমার ভালোবাসার পাঁচটি কারণ—ভাবনার স্বাধীনতা, কল্পনাকে বাস্তবে রূপ দেওয়া, কারুশিল্পীদের জন্য প্ল্যাটফর্ম তৈরি, গ্রাহকের প্রশংসা আর কাজের অবারিত সুযোগ। এখনো অনেক কাজ বাকি।”
অনুসন্ধানী মনটাই তাঁকে বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলগুলোতে নিয়ে যায়। আড়ংয়ের শুরুর দিকে কাজ ছিল দেশের প্রতিটি সম্ভাব্য কারুশিল্প নথিবদ্ধ করা। সাহা গ্রামগঞ্জ চষে বেড়ান, পরিচিত হন অসংখ্য কারুশিল্পীর সঙ্গে—বাঁশের বুনন, মৃৎশিল্প, সূচিশিল্প, জামদানির প্রতিটি খুঁটিনাটি সংগ্রহ করেন নকশাগারের জন্য।
তিনি বলেন, “রাজশাহীতে রেশম, মানিকগঞ্জে ব্লক প্রিন্ট আর হাতের সূচিশিল্প, জামালপুরে নকশিকাঁথা, বাউফলে মৃৎশিল্প—এরা প্রত্যেকেই তাদের পূর্বপুরুষের জ্ঞান বহন করে। কিন্তু ঢাকার মতো শহর কীভাবে কাজ করে, তা অনেকেই জানতেন না। মাটির তৈরি কাপ-পিরিচ গ্রামে ব্যবহারের জন্য হলেও আড়ংয়ের ডিজাইন স্টুডিও এই ধারণাকে শহুরে জীবনে নতুন পরিচয় দিয়ে লাইফস্টাইল পণ্যে পরিণত করেছে।”
একটি সাধারণ উদাহরণ দেন—মোমবাতি। তিনি বলেন, তখন মোমবাতি শুধু মন্দির বা গির্জায় দেখা যেত। আমাদের ডিজাইন কাজের মাধ্যমে এটি হয়ে উঠেছে সাজসজ্জার উপকরণ, এমনকি মানসিক চাপ উপশমকারী।
২০০১ সালে তিনি আড়ং থেকে বিরতি নেন। এরপর ২০২৩ সালে সিনিয়র কনসালট্যান্ট (ক্র্যাফটস অ্যান্ড ডিজাইন) হিসেবে আড়ংয়ে ফিরে আসেন। এখন তিনি কাজ করছেন খাদি, আদিবাসী কারুশিল্প, হাতে তৈরি ও পুনর্ব্যবহারযোগ্য কাগজ এবং প্রাকৃতিক পাতার পণ্যসহ পরিবেশবান্ধব উপাদান নিয়ে।

চন্দ্র শেখর সাহা। ছবি: সৌজন্যে
সংগ্রহশালা গড়ে তোলার জন্য সাহা জামদানি নিয়েও বিস্তৃত গবেষণা করেছেন। তাঁর নেতৃত্বে ভারত ও ইউরোপের জাদুঘর ও ব্যক্তিগত সংগ্রহে থাকা পুরোনো জামদানি নথিবদ্ধ করা, শত শত মোটিফ পুনরায় আঁকা এবং স্থানীয় তাঁতিদের দিয়ে তা পুনরুৎপাদন করা হয়েছে। ১৯৮১ সালে আড়ংয়ের প্রথম জামদানি প্রদর্শনীতে এই নকশাগুলো উঠে আসে; তখন পর্যন্ত তিন শতাধিক হারিয়ে যাওয়া ডিজাইন ফিরে এসেছিল আলোয়।
প্রদর্শনীটি জাতীয় পর্যায়ে আলোড়ন তোলে এবং বাংলাদেশে জামদানির পুনর্জাগরণের অন্যতম মাইলফলক হিসেবে প্রশংসিত হয়। পরবর্তী সময়ে এই ঐতিহ্য ইউনেসকোর ‘ইনট্যানজিবল কালচারাল হেরিটেজ’ হিসেবে স্বীকৃতি পায়। বহু বছর পর, আরেকটি জামদানি উৎসব সাজাতে গিয়ে সাহা একটি ছোট অথচ মনে গেঁথে থাকার মতো নকশাগত সিদ্ধান্তের মুখোমুখি হন।
তিনি বলেন, “আমাদের কাছে তাঁতিদের নামসহ একটি বোর্ড ছিল। আমি কাঠমিস্ত্রি মোতাহারকে বললাম, বোর্ডের লেখাগুলো অনেক নিচে। তখন তিনি বললেন, মানুষ যেন নিচু হয়ে এই অসাধারণ সৃষ্টির কারিগরদের নাম পড়ে। আমি কিছু বলতে পারিনি। তিনি ঠিকই বলেছিলেন। আমাদের তাঁতিরা এই সম্মান পাওয়ার যোগ্য।”
১৯৮৫ সালে আড়ংয়ের উদ্যোগে সাহা ভারতের আহমেদাবাদের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ডিজাইনে (এনআইডি) ভর্তি হওয়ার সুযোগ পান। সেখানে তিনি ডিজাইন গবেষণা ও নথিবদ্ধকরণের মৌলিক বিষয়ে শিক্ষা নেন। তিনি বলেন, “এই সুযোগটির জন্য আমি অত্যন্ত কৃতজ্ঞ। আমি সেখানে ১৮ মাস ছিলাম, এটা ছিল দারুণ অভিজ্ঞতা। যত বেশি দেখবেন, তত বেশি শিখবেন।”
আড়ং নিয়ে কথা বলার সময় তাঁর চোখে গর্বের ঝিলিক থাকলেও, সাহার কাজের পরিধি দেশের আরও বহু প্রতিষ্ঠানের মধ্যেও বিস্তৃত। তিনি বলেন, “আমি সবসময় কোনো না কোনো কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকি।”
কারুশিল্প, ফ্যাশন ও প্রোডাক্ট ডেভেলপমেন্টে দুই দশকেরও বেশি অভিজ্ঞতা নিয়ে তিনি একজন দক্ষ ডিজাইন পরামর্শক ও উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করছেন। আড়ংয়ের সিনিয়র কনসালট্যান্ট হওয়ার পাশাপাশি তিনি জয়িতা ফাউন্ডেশন, শেভা ও ফ্রেন্ডশিপসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে উপদেষ্টা হিসেবে যুক্ত আছেন। তিনি কে ক্রাফট, অঞ্জন’স, নগরদোলা ও রঙ-সহ বাংলাদেশের শীর্ষস্থানীয় ব্র্যান্ডগুলোর সঙ্গেও দীর্ঘদিন কাজ করেছেন।
তিনি শান্ত-মারিয়াম বিশ্ববিদ্যালয়ে ফ্যাশন বিভাগে শিক্ষকতা করেছেন এবং এখনো শিক্ষার্থীদের গবেষণা তত্ত্বাবধানে যুক্ত আছেন। তিনি নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থাপত্য বিভাগেও শিক্ষকতা করেছেন। অনেক অর্জনের পাশাপাশি তিনি ‘কাজপাগল’ হিসেবেও পরিচিত। তবে কাজের বাইরে তাঁর একটি প্রিয় শখ—রান্না।
সাহার বিশ্বাস, ডিজাইন ও রান্না—দুটোই রূপান্তরের শিল্প। তিনি ব্যাখ্যা করেন, ডিজাইনে যেমন উপকরণ থাকে, রান্নায় থাকে রেসিপি। ডিজাইন মেথডোলজি অনুসরণ করে, আর রান্না অনুসরণ করে নিজস্ব কৌশল। তিনি আরও বলেন, “পুডিং তো কয়েকটি ডিম মাত্র, যতক্ষণ না তা পুডিং হয়ে ওঠে। একটি শার্টও কেবল সুতা, যতক্ষণ না তা আকৃতি পায়। দুটোই প্রক্রিয়া ও ধৈর্যের ওপর নির্ভর করে।”
টেক্সটাইল, কারুশিল্প ও ফ্যাশনের সঙ্গে এক জীবন কাটিয়ে তিনি এখনো কাজ করে যেতে চান এবং তাঁর অভিজ্ঞতা নতুনদের সঙ্গে ভাগ করে নিতে চান। নতুন প্রজন্মের ডিজাইনারদের তিনি প্রতিশ্রুতিশীল মনে করেন। তাঁর ভাষায়, “আমাদের সময়ে জ্ঞানার্জনের সুযোগ এখনকার মতো ছিল না। তবে আমি চাই ভবিষ্যৎ প্রজন্ম শুধু আধুনিকতার পেছনে না ছুটে, আমাদের ঐতিহ্য ও শেকড়কেও ধরে রাখুক।”