শতবর্ষে এলিজাবেথ: সময়, ইতিহাস ও এক রাজমুকুটের গল্প
৬ ফেব্রুয়ারী ১৯৫২। বেজে উঠলো ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী স্যার আন্থনী ইডেনের টেলিফোন।
শতবর্ষে এলিজাবেথ: সময়, ইতিহাস ও এক রাজমুকুটের গল্প
৬ ফেব্রুয়ারী ১৯৫২। বেজে উঠলো ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী স্যার আন্থনী ইডেনের টেলিফোন।
প্রধানমন্ত্রী উইনস্টন চার্চিলের দপ্তর থেকে উচ্চারণ করা হলো মাত্র তিনটি শব্দ-“HYDE PARK CORNER”.
ব্যস! পুরো ব্রিটিশ সাম্রাজ্যে দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়লো সংবাদ “বাকিংহাম প্রাসাদে পতাকা নামিয়ে ফেলা হয়েছে। রাজা ষষ্ঠ জর্জ আর নেই।”
পিতার মৃত্যুর পর সিংহাসনে বসলেন দ্বিতীয় এলিজাবেথ। মাত্র ২৫ বছর বয়সের তরুনীর রাজ্যাভিষেকে খুব কম মানুষই ধারণা করেছিল তিনিই হতে যাচ্ছেন ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ইতিহাসের দীর্ঘতম শাসিকা।
আজ এলিজাবেথের ১০০তম জন্মদিন।
কিন্তু ২০২২ সালে তার বিদায়ে সারা পৃথিবীজুড়ে উঠা আলোড়নের নেপথ্য কারণ কি শুধুই নিখাদ শোক, নাকি শতাব্দীপ্রাচীন দাসপ্রথার হ্যাংওভার?
এলিজাবেথ যখন সিংহাসনে বসেন, প্রবলপ্রতাপ ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের সূর্য ততদিনে অস্ত গেছে। রাজতন্ত্রের যুগাবসান ঘটিয়ে পৃথিবীর বুকে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে প্রজাতন্ত্রের উন্মাদনা। পুবদিক থেকে সোভিয়েত রাশিয়ার সমাজতন্ত্রের হাওয়া আর পশ্চিম থেকে মার্কিন গনতন্ত্রের দ্বিমুখী চাপে ব্রিটিশ সিংহাসন তখন টালমাটাল।
তরুণী এলিজাবেথ তখন মুমূর্ষুপ্রায় রাজাভিজাত্যের প্রতীকমাত্র।গণতান্ত্রিক ব্রিটেনে সিংহাসন তখন নখদন্তহীন ঠুঁটো জগন্নাথ। রাজকীয় কিছু অনুষ্ঠান আয়োজন এবং ডাউনিং স্ট্রিটের সকল সিদ্ধান্তে বিনাবাক্যব্যয়ে সীলমোহর দেওয়াই বাকিংহাম প্যালেসের একমাত্র দায়িত্ব। সত্তর বছরের শাসনকালে এলিজাবেথ এই নিয়মের খুব একটা ব্যতয় ঘটাননি।
তাই সুদীর্ঘ শাসনামল ঘটনাবহুল হলেও তাঁর ভূমিকা নিতান্তই গৌণ, পার্শ্বচরিত্রের চেয়ে বেশি কিছু না। নির্মোহ ইতিহাসের পাতায় তাঁকে বিচার করলে উপনিবেশিক যুগের শেষ চিহ্ন হিসেবেই তাঁকে মনে রাখা হবে। তাই কালের পরিক্রমায় তাঁর ঠাঁই হবে ম্যানিকিন হিসেবেই, মহীয়সী নারীদের কাতারে নয়।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে পৃথিবী জুড়ে ইঙ্গ-মার্কিন নগ্ন আগ্রাসনের দায় কি রানি এড়াতে পারবেন? পারবেন সিরিয়ায় নাপাম বোমায় বিক্ষত হওয়া শিশুদের সামনে দাঁড়াতে? আফ্রিকায় দুর্ভিক্ষে কঙ্কালসাড় হওয়া মায়ের বুকে দুধ খুঁজে না পেয়ে শিশুদের মৃত্যুতে কি রানির কোনোই দায় নেই?
ইতিহাসের দায়ও তো কম নয়! বাকিংহামের প্রতিটা ইট, প্রতিটা আস্তরণ ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের কালো অতীতের সাক্ষী। আফ্রিকার হাজার হাজার মানুষকে দাসত্বের বেড়ী পরিয়ে তাদের রক্তে ফুলে-ফেঁপে উঠেছিল ব্রিটিশ রাজপরিবার। যে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের সূর্য কখনো অস্ত যায় না, সেই সাম্রাজ্য গড়ে তুলতে আর টিকিয়ে রাখতে যে নির্মমতার আশ্রয় নেওয়া হয়েছিল, তার প্রতিশোধে যদি একবার করেও পাথর নিক্ষেপ করা হয়, কোনো সন্দেহ নেই যে টেমস নদীতে আর পানির স্রোত যাওয়ার জায়গা থাকবে না।
আর এই নির্মমতার সবচেয়ে দীর্ঘ ছায়া পড়েছিল এই আমাদের বাসভূমিতে, ভারত উপমহাদেশে।শঠতার আশ্রয় নিয়ে একটা ভূখণ্ড, একটা সভ্যতা, যাকে ধীরে ধীরে রক্তশূন্য করে ফেলা হয়েছিল। ব্রিটিশ মুকুট শুধু শাসন ছিল না, ছিল এক নির্লজ্জ লুটপাটের চিহ্ন। অক্সফোর্ড বিতর্কে ভারতীয় সাংসদ শশী থারুর যথার্থই বলেছিলেন যে “The Sun never set on the British Empire because The God himself could not trust the British in the dark”
কৃষকের ধান গেছে, কারিগরের হাত থেমে গেছে, আর লন্ডনের কারখানায় আলো জ্বলেছে সেই অন্ধকার দিয়েই। বাকিংহামের প্রাসাদের রাজপরিবারের সদস্যরা তখন বলনাচের আয়োজন করেছেন।
১৭৭০-এর Great Bengal Famine-এ মাটি শুধু ফসল দেয়নি, লাশও দিয়েছে। ১৯৪৩ এর দূর্ভিক্ষে মা তার সন্তানের নিথর দেহ কোলে নিয়ে বসে থেকেছে। আর সেই সময়েও শাসকের চোখে মানুষ ছিল শুধু সংখ্যা, পরিসংখ্যান।
১৯৪৭-এর ভারতভাগ সেটা কি স্বাধীনতার উল্লাস, নাকি এক অমানবিক বিদায়ের মূল্য? ট্রেনভর্তি লাশ, আগুনে পুড়ে যাওয়া গ্রাম, ভিটেমাটি হারানো মানুষ, এই ছবিগুলো কি শুধুই ইতিহাসের বইয়ের জন্য?
এই সবকিছুর অনেক কিছুই ঘটেছে দ্বিতীয় এলিজাবেথ সিংহাসনে বসার আগে। কিন্তু তিনি কি ছিলেন না সেই ধারাবাহিকতার প্রতীক? সেই মুকুট, সেই প্রাসাদ, সেই ঐতিহ্য যার প্রতিটা স্তরে জমে আছে সহস্রাব্দের রক্তের ঋণ, ইতিহাসের দায়?
ব্রিটিশ রাজপরিবার এবং তার প্রধান হিসেবে রানি এলিজাবেথ শুধু ব্রিটেনের আভিজাত্য বা ঐতিহ্যের প্রতীক নয়; এটি বর্ণবাদী শ্রেষ্ঠত্ববোধ, উপনিবেশিক মানসিকতা, এবং দীর্ঘদিনের শোষণ-নির্মমতারও প্রতীক, যার ছায়া আজও ইতিহাসের ভাঁজে, মানুষের স্মৃতিতে, এবং বৈশ্বিক বৈষম্যের বাস্তবতায় স্পষ্ট হয়ে আছে।
তাদের রেখে যাওয়া কলোনিয়াল মানসিকতা যে আজও আমাদের ত্যাগ করেনি তার প্রমাণ পাওয়া যায় তার মৃত্যুতে আমাদের বুকভরা মাতমে। আমাদের পূর্বপুরুষের রক্তে যে পরিবার রাতের রুটি চুবিয়ে খেয়েছে, যাদের চাবুকের দাগ এখনো দগদগে, তাদের মৃত্যুতে আমাদের শোক কি জাতিগত দৈন্যতার পরিচয় নয়?
ঝলমলে আলোকসজ্জায় মোড়ানো রাজার অভিষেক অনুষ্ঠান কি ভোলাতে পারে জালিয়ানওয়ালাবাগের স্মৃতি? ঝাঁসির রানি লক্ষীবাঈ বা টিপু সুলতানদের আজন্ম সংগ্রামের চেয়ে কি বেশি ঐতিহ্য বহন করে রাজপরিবারের আনুষ্ঠানিকতা? কখনো কি ক্ষুদিরাম বসুদের ছাপিয়ে ইতিহাসের পাতায় পুজিত হবেন “মহান” রানি এলিজাবেথ?
ব্রিটেন তার শোক পালন করুক। যুগ যুগ ধরে বয়ে নিয়ে যাক রাজতন্ত্রের স্মৃতি। কিন্তু সেই শোকের অংশীদার আমরা হতে পারি না। স্বর্গের দরজায় রানির মুকুটে লাথি মারুক আমাদের নেতাজি সুভাষ বোস- পৃথিবীজুড়ে উপনিবেশিক শোষণের জালে পিষ্ঠ হওয়া আপামর জনমানুষের ক্রোধকে লিপিবদ্ধ করুক মহাকাল। রক্তের কালি দিয়েই লেখা হোক প্রতিবাদ-
“আমার রক্ত, আমার ক্ষত
আমার ইতিহাস, আমার ফেথ
আমাদের কাছে কেবলই দস্যু
তোমাদের রানি এলিজাবেথ”