স্পেসএক্স কি মহাকাশে নতুন ‘ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি’?

নিশ্চিতভাবেই স্পেসএক্স এখনই মানুষের ওপর কর আরোপ বা শাসন করতে যাচ্ছে না, কারণ মহাকাশে (আমাদের জানা মতে) কোনো বাসিন্দা নেই। তবুও, আমরা এমন একটি প্রতিষ্ঠানকে দেখছি যারা যেকোনো সার্বভৌম রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণের বাইরে গিয়ে কাজ করছে।

Elon Musk East India Company

১২ জুন রকেট নির্মাতা প্রতিষ্ঠান স্পেসএক্সের বহুল প্রতীক্ষিত শেয়ারবাজারে আত্মপ্রকাশের মাধ্যমে ইলন মাস্ক ইতিহাস গড়েছিলেন। ন্যাসডাক শেয়ারবাজারে কোম্পানিটির প্রাথমিক গণপ্রস্তাবের (আইপিও) শেয়ারপ্রতি মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছিল ১৩৫ ডলার এবং লেনদেন শুরু হওয়ার সময় তা ১৫০ ডলারে উন্মুক্ত হয়েছিল। এই আত্মপ্রকাশের ফলে রকেট ও কৃত্রিম উপগ্রহ নির্মাতা প্রতিষ্ঠানটির বাজারমূল্য ১ দশমিক ৭৭ ট্রিলিয়ন ডলারেরও বেশি হয়।

মাস্কের মালিকানায় স্পেসএক্সের প্রায় ৪২ শতাংশ শেয়ার থাকায় কোম্পানিটির তালিকাভুক্তি তার কাগুজে সম্পদের মূল্যকে তাৎক্ষণিকভাবে ১ ট্রিলিয়ন ডলারের সীমার ওপরে নিয়ে যায়। ১৬ জুনের মধ্যে বিনিয়োগকারীদের প্রবল আগ্রহে স্পেসএক্সের শেয়ারের মূল্য সর্বোচ্চ ২২৫ দশমিক ৬৪ ডলারে পৌঁছে যায়। ফলে মাস্কের মোট সম্পদের পরিমাণও সর্বোচ্চ ১ দশমিক ৩২ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছে যায়।

তবে মাস্ক মঙ্গলবার (২৩ জুন) তার ট্রিলিয়নিয়ার মর্যাদা হারিয়েছেন। স্পেসএক্সের শেয়ারবাজারে অভিষেকের পর বিশ্বের প্রথম ব্যক্তি হিসেবে ট্রিলিয়ন ডলারের সম্পদের মালিক হওয়ার দুই সপ্তাহেরও কম সময় পর এই ঘটনা ঘটেছে বলে ব্লুমবার্গের প্রতিবেদনে জানা গেছে।

স্পেসএক্স এমন একটি দ্রুত-বর্ধনশীল প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান, যার স্থান বিশ্বের সবচেয়ে বড় ও শক্তিশালী কোম্পানিগুলোর পাশে হওয়া উচিত। কিন্তু ইতিহাস আরেকটি, কম আশাব্যঞ্জক গতিপথের ইঙ্গিত দেয়। কারণ স্পেসএক্সের সঙ্গে সবচেয়ে বেশি মিল অ্যাপল বা এনভিডিয়ার নয়; বরং প্রায় ৩০০ বছর টিকে থাকা ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির।

নিশ্চিতভাবেই স্পেসএক্স এখনই মানুষের ওপর কর আরোপ বা শাসন করতে যাচ্ছে না, যেমনটা পুরনো আমলের চার্টার্ড কোম্পানিগুলো করত। কারণ মহাকাশে (আমাদের জানা মতে) কোনো বাসিন্দা নেই। তবুও, আমরা এমন একটি প্রতিষ্ঠানকে দেখছি যারা যেকোনো সার্বভৌম রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণের বাইরে গিয়ে কাজ করছে। এটি ইতিমধ্যে এমন বিশাল ক্ষমতা অর্জন করেছে যা পুনরুদ্ধারে সরকারগুলো এখন হিমশিম খাচ্ছে।

১৫৭০ থেকে ১৮৬০ সালের মধ্যে ইউরোপীয় রাষ্ট্রগুলো অনিয়ন্ত্রিত সমুদ্রগুলোতে তাদের ক্ষমতা বিস্তারের জন্য ব্রিটিশ, ডাচ এবং ফরাসি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির মতো জয়েন্ট-স্টক কোম্পানিগুলোকে ব্যবহার করত।

এই চার্টার্ড কোম্পানিগুলো ছিল এক ধরণের সংকর প্রতিষ্ঠান—বাণিজ্যিক উদ্যোগ হওয়ার পাশাপাশি তারা রাষ্ট্রের হাতিয়ার হিসেবেও কাজ করত। তারা একচেটিয়া বাজার গড়ে তুলত এবং আইনের অনুপস্থিতিতে নিজেদের নিয়ম নিজেরা তৈরি করত। মুদ্রা তৈরি করা এবং স্থানীয়দের ওপর পুলিশি ব্যবস্থা চালানো থেকে শুরু করে যুদ্ধ করা ও চুক্তি সই করার মতো রাষ্ট্রীয় কাজও তারা পরিচালনা করত। এডমন্ড বার্ক ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে ‘বণিকের ছদ্মবেশে একটি রাষ্ট্র’ বলে অভিহিত করেছিলেন। এখন পৃথিবীর কক্ষপথে যেন সেই একই কাঠামোর পুনরাবৃত্তি ঘটছে।

প্রথমে একচেটিয়া আধিপত্যের কথা বিবেচনা করা যাক। রকেট বুস্টার ল্যান্ড করানো এবং তা পুনরায় ব্যবহারের মাধ্যমে স্পেসএক্স এক জটিল সমস্যার সমাধান করেছে। যেহেতু রকেট পুনরায় ব্যবহারযোগ্য হওয়া কেবল উচ্চ উৎক্ষেপণ হারের ক্ষেত্রেই লাভজনক, তাই কোম্পানিটি স্টারলিংক তৈরি করেছে। হাজার হাজার স্যাটেলাইটের এই নেটওয়ার্ক তাদের নিয়মিত রকেট উৎক্ষেপণের নিশ্চয়তা দেয়। যেসব প্রতিদ্বন্দ্বীর কাছে রকেট এবং স্যাটেলাইট সংযোগের নিজস্ব চাহিদা নেই, তাদের পক্ষে এই বাজারে প্রবেশ করা সহজ নয়।

একটি নতুন গবেষণাপত্র অনুযায়ী, মহাকাশে পণ্য পাঠানোর ক্ষেত্রে স্পেসএক্সের বৈশ্বিক অংশীদারিত্ব ২০১৪ সালের ১০ শতাংশের নিচে থেকে বেড়ে বর্তমানে প্রায় ৮০ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে এই হার ৯৪ শতাংশ, যেখানে নাসা তাদের অন্যতম বড় গ্রাহক। এই প্রক্রিয়ায় স্পেসএক্স কক্ষপথের দুর্লভ স্লট এবং রেডিও স্পেকট্রাম দখল করে নিয়েছে, যা ভবিষ্যতে নতুনদের আসার পথ কঠিন করে তুলছে। এটি পাঠ্যবইয়ে থাকা সাধারণ প্রযুক্তি বাজারের একচেটিয়া ব্যবস্থা নয়, বরং এটি অনেক পুরোনো কিছুর কথা মনে করিয়ে দেয়।

এরপর আসা যাক আইনি শূন্যতার প্রশ্নে। ১৯৬৭ সালের ‘আউটার স্পেস ট্রিটি’ বা মহাকাশ চুক্তি এমন এক সময়ের জন্য লেখা হয়েছিল যখন মহাকাশে কেবল সরকারগুলোর আধিপত্য ছিল। সেখানে বলা হয়েছিল, মহাকাশ কোনো জাতির সার্বভৌমত্বের দাবি বা দখলদারিত্বের বিষয় নয় এবং এটি পুরো মানবজাতির কল্যাণের জন্য সংরক্ষিত। তবে এই নিয়ম কার্যকর করার কোনো শক্তিশালী ব্যবস্থা সেখানে নেই।

এই বিশাল আইনি শূন্যতার সুযোগ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ২০১৫ সালে ‘কমার্শিয়াল স্পেস লঞ্চ কম্পিটিটিভনেস অ্যাক্ট’ এবং ২০২০ সালে ‘আর্টেমিস অ্যাকর্ডস’ চালু করে। এর মাধ্যমে দাবি করা হয়, মহাকাশ থেকে সম্পদ আহরণ কোনো ‘দখলদারি’ নয়। স্পেসএক্সের জন্য ঠিক এমন পরিবর্তনেরই প্রয়োজন ছিল। একইভাবে, তিন শতাব্দী আগে কোনো কোম্পানির ‘চার্টার’ ছিল একই সাথে বাণিজ্যের লাইসেন্স এবং আইন হিসেবে সাজানো একতরফা দাবি। উভয় ক্ষেত্রেই প্রথম সুযোগ গ্রহণকারীরা নিজেদের জন্য নিজেরাই নিয়ম লিখেছে।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সাদৃশ্য হলো রাষ্ট্রীয় ও বেসরকারি ক্ষমতার সীমারেখা ঝাপসা হয়ে যাওয়া। ২০২২ সালে ইলন মাস্ক ইউক্রেনকে রাশিয়ার নৌবহরের বিরুদ্ধে হামলা চালাতে সহায়তা করার জন্য ক্রিমিয়ার ওপর স্টারলিংক সেবা চালু করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন। কার্যত একজন ব্যক্তিই একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের সিদ্ধান্তে ভেটো দিয়েছিলেন, এবং যুক্তরাষ্ট্র সরকারও সহজে সেই সিদ্ধান্ত অগ্রাহ্য করতে পারেনি। ভবিষ্যতে যখন কার্যক্রম চাঁদে বিস্তৃত হবে তখন মানদণ্ড নির্ধারণ, সম্পদ দাবির ব্যবস্থাপনা এবং আর্টেমিস অ্যাকর্ডস অনুযায়ী রাষ্ট্রগুলো যে ‘নিরাপত্তা অঞ্চল’ ঘোষণা করতে পারে, সেগুলোর তদারকিতে স্পেসএক্স উল্লেখযোগ্য প্রভাব বিস্তারের অবস্থানে থাকবে। ফলে একটি বেসরকারি কোম্পানি এমন প্রশ্নের উত্তর নির্ধারণ করতে পারে, যা মূলত রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্বের সঙ্গে সম্পর্কিত।

ব্রিটেন যেমন ডাচদের মসলা বাণিজ্য থেকে দূরে রাখতে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে বিশেষ অধিকার দিয়েছিল, যুক্তরাষ্ট্রও চীনের আগে মহাকাশে কৌশলগত আধিপত্য গড়তে স্পেসএক্সকে ক্ষমতায়িত করেছে। কিন্তু প্রতিষ্ঠানটি যত বেশি অপরিহার্য হয়ে উঠছে, রাষ্ট্রের কর্তৃত্ব তত কমছে। গত বছর প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং মাস্কের প্রকাশ্য বিবাদে এই নাজুক পরিস্থিতি স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে। ট্রাম্প স্পেসএক্সের সরকারি চুক্তি বাতিলের হুমকি দিয়েছিলেন, আর মাস্ক হুমকি দিয়েছিলেন আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে মার্কিন সরকারের প্রবেশাধিকার বন্ধ করে দেওয়ার। একটি নামমাত্র সার্বভৌম শক্তি নিজেকে এমন এক পক্ষের ওপর নির্ভরশীল দেখতে পেল যাকে তারা তোষণ করতে পারে কিন্তু হুকুম দিতে পারে না।

চার্টার্ড কোম্পানিগুলোর আমলের শিক্ষা হলো, এ ধরণের ক্ষমতা একবার জেঁকে বসলে তা ফিরিয়ে আনা অসম্ভব কঠিন। ব্রিটেন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণে নিয়েছিল কেবল ১৮৫৮ সালে—একটি দুর্ভিক্ষ, আর্থিক সংকট এবং রক্তক্ষয়ী বিদ্রোহের (যা ব্রিটিশদের কাছে ‘সিপাহি বিদ্রোহ’ এবং ভারতীয়দের কাছে ‘প্রথম স্বাধীনতা যুদ্ধ’) পর। কিন্তু ততক্ষণে এর জন্য যে চড়া মূল্য দিতে হয়েছিল তা ছিল বিধ্বংসী।

এই ইতিহাস একই সঙ্গে ইঙ্গিত দেয়, খুব দেরি হওয়ার আগেই সরকারগুলোর এখন কী করা উচিত। নিয়ন্ত্রণ পুনঃপ্রতিষ্ঠার লক্ষ্য কোনো সফল প্রতিষ্ঠানকে ভেঙে ফেলা নয়; বরং তার ওপর রাষ্ট্রের নির্ভরতা সীমিত করা। এ ক্ষেত্রে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ইউরোপীয় প্রতিদ্বন্দ্বীদের অভিজ্ঞতা বেশি প্রাসঙ্গিক। পর্তুগিজ ও ফরাসি রাজতন্ত্র নিজ নিজ চার্টারপ্রাপ্ত কোম্পানিতে অংশীদারিত্ব ধরে রেখেছিল, যার মাধ্যমে তারা ভেতর থেকেই কিছু কৌশলগত নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করেছিল। সার্বভৌম ক্ষমতার মতো প্রভাব বিস্তারকারী প্রতিষ্ঠানে সরকার-মনোনীত পরিচালনা পর্ষদের সদস্য বা যুক্তরাষ্ট্র সম্প্রতি ইন্টেলে যে ধরনের সংখ্যালঘু অংশীদারিত্ব নিয়েছে, সে ধরনের অংশীদারিত্ব নিরাপত্তা অঞ্চল, সম্পদ দাবি এবং গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর ওপর তদারকি নিশ্চিত করতে পারে—আবার একই সঙ্গে বেসরকারি খাতের সেই প্রণোদনাও বজায় রাখতে পারে, যা এ খাতকে গতিশীল করেছে।

বর্তমান যুগের উদীয়মান প্রযুক্তিনির্ভর ‘সার্বভৌম’ প্রতিষ্ঠানগুলোর আচরণের ওপর কিছুটা নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার সুযোগ দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে। নীতিনির্ধারকদের সামনে এখন প্রশ্ন হলো, ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি শেষ পর্যন্ত কী হয়েছিল তা জানা কি তার একবিংশ শতাব্দীর উত্তরসূরিকে একই পথে হাঁটা থেকে বিরত রাখার জন্য যথেষ্ট হবে? স্পেসএক্সের আইপিও সেই প্রশ্ন তোলার উপযুক্ত সময়।