পুনর্নির্ধারিত মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষার তিন দিন আগে আত্মহত্যা করা ১৭ বছর বয়সী কাহান প্যাটেল। ছবি: রয়টার্স
পুনর্নির্ধারিত মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষার তিন দিন আগে আত্মহত্যা করা ১৭ বছর বয়সী কাহান প্যাটেল। ছবি: রয়টার্স

ভারতের নতুন করে নির্ধারিত মেডিকেল প্রবেশিকা পরীক্ষা শুরু হওয়ার ঠিক তিন দিন আগে, ১৭ বছর বয়সী কাহান প্যাটেল দেশের পশ্চিমাঞ্চলীয় শহর আহমেদাবাদে তাঁর পরিবারের অ্যাপার্টমেন্ট ভবনের ষষ্ঠ তলা থেকে ঝাঁপ দেন।

গত ১৮ জুন ভোরে তাঁর মৃত্যুর পর পরিবারের সদস্যরা যখন তাঁর শোবার ঘরে প্রবেশ করেন, তখন সবকিছু এমনভাবে সাজানো ছিল যেন মনে হচ্ছিল সে যেকোনো মুহূর্তে ঘরে ফিরে আসবে।

তাঁর ল্যাপটপটি তখনও খোলা ছিল। বিছানা ও পড়ার টেবিলে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ছিল পাঠ্যবই, নোটবুক, কলম ও মার্কার। যখন সে ঝাঁপ দেয়, তখনও তাঁর কানে হেডফোন লাগানো ছিল। ঘরের এক কোণে একটি ইলেকট্রিক গিটার অ্যামপ্লিফায়ারের সাথে সংযুক্ত ছিল। তাকে রাখা বুকশেলফগুলোতে সাজানো ছিল হ্যারি পটার সিরিজ, এলন মাস্কের জীবনী, গুজবামস হরর সিরিজের বই এবং বেশ কিছু বোর্ড গেম। সেখানে ‘ধারাবাহিক একাডেমিক পারফরম্যান্স’-এর জন্য পাওয়া একটি ট্রফিও রাখা ছিল।

ছেলে কাহানের ভালো স্কুলে পড়াশোনা ও মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য পরিবারসহ আহমেদাবাদে চলে যান প্রশান্ত প্যাটেল। ছবি: রয়টার্স

কাহানের বাবা প্রশান্ত প্যাটেল মৃদু কণ্ঠে বলেন, ‘শুধু কাহান নেই।’

কথিত প্রশ্ন ফাঁসের জেরে এ বছরের ন্যাশনাল এলিজিবিলিটি কাম এন্ট্রান্স টেস্ট (নিট) বাতিল হয়ে যাওয়ার পর পুঞ্জীভূত ক্ষোভে যে ২১ জন শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছেন, কাহান তাঁদেরই একজন। এই প্রশ্ন ফাঁসের ফলে প্রায় ২০ লাখ শিক্ষার্থীকে পুনরায় পরীক্ষায় বসতে বাধ্য করা হয়।

এই তরুণদের অকাল মৃত্যু মূলত গত জুলাইয়ে দিল্লির রাস্তায় নেমে আসা এক নজিরবিহীন ছাত্র আন্দোলনের আবেগময় শক্তিতে পরিণত হয়েছিল, যেখানে হাজার হাজার শিক্ষার্থী বারবার পরীক্ষা নেওয়ার এই ব্যর্থতার জবাবদিহিতা দাবি করেছিলেন। ব্যঙ্গাত্মক রাজনৈতিক দল ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি)-র নেতৃত্বে ও টানা কয়েক দিনের আন্দোলনের পর অবশেষে পদত্যাগ করতে বাধ্য হন শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান।

তবে এই রাজনীতির আড়ালে ছিল কাহানের মতো পরিবারগুলো—যারা বোঝার চেষ্টা করছিল যে, কীভাবে একটি পরীক্ষার কেলেঙ্কারি জীবন-মৃত্যুর বিষয় হয়ে দাঁড়াল।

প্রশান্ত প্যাটেলের জন্য এই গল্পের শুরু ছেলের মৃত্যু দিয়ে নয়, বরং একটি বড় স্বপ্ন দিয়ে।

স্কুলের পড়াশোনা শেষ করার পর কাহান ঘোষণা করেছিল যে সে একজন ডাক্তার হতে চায়। তাঁদের পরিবারে কোনো ডাক্তার ছিল না। তাঁর বাবা-মা ছেলের সেই স্বপ্নকে ঘিরে নিজেদের জীবন নতুন করে সাজিয়েছিলেন।

হীরক ও বস্ত্র শিল্পের কেন্দ্র সুরাট থেকে তাঁরা গুজরাটের বৃহত্তম শহর আহমেদাবাদে চলে আসেন, যাতে কাহান আরও ভালো স্কুলে পড়তে পারে এবং নিবিড় প্রস্তুতি নিতে পারে। পেশায় আইনজীবী তাঁর বাবা হাইকোর্ট ও কাহানের স্কুলের কাছাকাছি একটি ফ্ল্যাট কেনেন। এরপর কাহান তাঁর মা বীনা এবং ছোট ভাই রিহানের সাথে আহমেদাবাদে থাকতে শুরু করেন, আর তাঁর বাবা দুই শহরের মধ্যে যাতায়াত করতে থাকেন।

তাঁর বাবা বলেন, ‘সে নিজেই এই সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। আমরা শুধু তাকে সমর্থন জুগিয়েছিলাম।’

কাহান কেবল পাঠ্যবইয়ে বুঁদ হয়ে থাকা কোনো কিশোর ছিল না।

স্কুলের সমাপনী পরীক্ষায় ভালো ফল করার পর চিকিৎসক হওয়ার ইচ্ছার কথা জানিয়েছিল কাহান প্যাটেল। ছবি: রয়টার্স

সে স্কুলের দলের হয়ে ফুটবল খেলত, হ্যারি পটার ও পার্সি জ্যাকসনের উপন্যাস গোগ্রাসে গিলত, বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনীভিত্তিক সিনেমা পছন্দ করত এবং ঘণ্টার পর ঘণ্টা নিজে নিজেই হার্ড-রক গিটারের টিউন তোলার চেষ্টা করত। সম্প্রতি সে যুক্তরাষ্ট্রের ভিজিটর ভিসা পেয়েছিল এবং পরীক্ষার পর ডিজনিল্যান্ডে যাওয়ার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিল, যে জায়গাটি সে ১২ বছর আগে শৈশবে একবার পরিবারসহ ঘুরে এসেছিল।

সে ইতিমধ্যেই সাফল্যের স্বাদ পেয়েছিল।

২০২৪ সালের প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনার পর, সে প্রস্তুতি হিসেবে পরীক্ষামূলকভাবে নিট পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিল। তাঁর পারফরম্যান্স দেখে সে নিজে এবং তাঁর শিক্ষকেরা নিশ্চিত হয়েছিলেন যে সে সঠিক পথেই আছে।

গত ৩ মে পরীক্ষা শেষে অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসের সাথে সে হল থেকে বের হয়ে তাঁর বাবাকে ফোন করে।

কাহান তাঁর বাবাকে বলেছিল, ‘বাবা, আমি খুব খুশি। আমি নিজেকে খুব হালকা ও স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করছি। বন্ধুদের সাথে রাতের খাবার খেতে যাচ্ছি। অনেক আনন্দ করছি।’

প্রশান্ত প্যাটেল স্মৃতিচারণ করে বলেন, তিনি ছেলেকে বলেছিলেন, ‘এটি তোমার সময়। উপভোগ করো।’

এর পরপরই খবর আসে যে পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস হয়ে গেছে।

তাঁর বাবা-মা তাকে এই খবর থেকে দূরে রাখার চেষ্টা করলেও তা অসম্ভব ছিল। তাঁর কোচিং ক্লাসের বন্ধুরা ইতিমধ্যেই এই বিষয়ে আলোচনা শুরু করে দিয়েছিল। বন্ধুদের সাথে ফার্মহাউসের ছুটি কাটানো মাঝপথে রেখে সে দ্রুত বাড়ি ফিরে আসে এবং জুনিয়র শিক্ষার্থীদের দিয়ে দেওয়া নোট ও পাঠ্যবইগুলো আবার ফেরত চায়, যদি তাকে আবার পরীক্ষায় বসতে হয়।

কয়েক দিনের মধ্যেই সরকার পুনরায় পরীক্ষা নেওয়ার ঘোষণা দেয়।

তাঁর বাবা মনে করে বলেন, ‘তখনই সে ভীষণ রেগে গিয়েছিল।’

কাহান বারবার তাঁর বাবাকে প্রশ্ন করত, ‘এটি কেমন সিস্টেম? এভাবেই কি সব চলে? আমার অপরাধ কী? যাযাবর বা সাধারণ যেসব শিক্ষার্থী সততার সাথে পরীক্ষা দিয়েছে, তাদের অপরাধ কী? সরকার কেন বিষয়টিকে এত হেলাফেলা করছে?’

নিট পুনঃপরীক্ষার আগে আত্মহত্যা করা প্রদীপ কুমারের ছবি হাতে তার বোন ববিতা কুমার। ছবি: রয়টার্স

তাঁর বাবা তাকে আশ্বস্ত করার চেষ্টা করে বলেছিলেন, ‘এটাই আমাদের সিস্টেম। আমাদের কী-ই বা করার আছে?’

এখন তাঁর বাবা ভাবেন, তাঁর সেই সান্ত্বনার বাণী কি ছেলের কাছে সান্ত্বনা নাকি ভাগ্যের কাছে আত্মসমর্পণ বলে মনে হয়েছিল?

তিনি বলেন, ‘হয়তো সে হতাশ হয়েছিল। হয়তো সে ভেতরে ভেতরে অনেক কষ্ট পাচ্ছিল।’

কিন্তু কোনো কিছু দেখেই মনে হয়নি যে সে কোনো বড় সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।

মৃত্যুর আগের দিন ১৭ জুন সন্ধ্যায়, মেলবোর্নে থাকা ফুফুর কাছে যাওয়া নিজের নানার সাথে ভিডিও কলে বেশ প্রফুল্লভাবে কথা বলে কাহান। সে নানার কাছে পুমা ফুটবল বুট, লেভিস জিন্স এবং জ্যাকেট নিয়ে আসার জন্য আবদার করে।

সেদিন রাতে সে তাঁর বাবার সাথেও কথা বলেছিল। ফোন রাখার আগে তাঁর বাবা তাকে শেষ আশ্বাস দিয়ে বলেছিলেন, ‘তুমি নিজেকে একবার প্রমাণ করেছ। তোমাকে আর নতুন করে প্রমাণ করার কিছু নেই।’

এর মাত্র কয়েক ঘণ্টা পর, সে মারা যায়।

কাহানের মৃত্যুর পরই তাঁর বন্ধুরা তাঁর বাবাকে জানায় যে এই পরীক্ষার কেলেঙ্কারি তাকে কতটা গভীরভাবে আঘাত করেছিল।

তাঁর বাবা বলেন, ‘সে প্রতিনিয়ত প্রশ্ন করত কেন দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিরা সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারেন না। সে প্রায়ই বলত, মন্ত্রীদের কাছে এভাবে পরীক্ষা নেওয়াটা কি একটা তামাশা’। 

কাহানের পরিবার থেকে প্রায় ৭৭০ কিলোমিটার দূরে রাজস্থানের ঝুনঝুনু জেলায় আরেকটি পরিবারও একই রকম এক অকল্পনীয় ক্ষতি কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করছিল।

প্রদীপ কুমারের বয়স ছিল ২৩ বছর।

তাঁর বাবা রাজেশ কুমার এক প্রত্যন্ত গ্রামের একজন প্রান্তিক কৃষক, যে গ্রামে প্রদীপই ছিল একমাত্র ছেলে যে নিট পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছিল।

৪৫ বছর বয়সী রাজেশের নিজের পড়াশোনা বন্ধ হয়েছিল শৈশবেই। তাঁর স্ত্রীরও কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছিল না। ডাক্তার হতে পারলে প্রদীপই হতো তাঁদের পরিবারের প্রথম ব্যক্তি যিনি একটি মর্যাদাপূর্ণ পেশাদার মধ্যবিত্ত শ্রেণীতে প্রবেশ করতেন।

রাজেশ বলেন, ‘সে আমাকে বলত, আমি মানুষের এত সেবা করতে চাই যাতে তারা আমাকে মনে রাখে।’

ছেলের এই স্বপ্ন পূরণ করতে রাজেশ তাঁর নিজের চাষের জমি বিক্রি করেন এবং ব্যাংক থেকে ১০ লাখ টাকারও বেশি ঋণ নেন। ভারতের প্রবেশিকা পরীক্ষার বড় কোচিং হাব ‘সিকার’-এ পড়ার খরচ ছিল আকাশছোঁয়া।

২০২২ সালে প্রদীপ কোচিংয়ের জন্য সিকারে চলে আসে এবং পুলিশ নিয়োগ পরীক্ষার প্রস্তুতি নেওয়া তাঁর বড় বোন ববিতা কুমারীর সাথে একটি ভাড়া ঘরে থাকতে শুরু করে। দুইবার নিট পরীক্ষায় অংশ নিয়ে প্রদীপ তাঁর র‍্যাংক উন্নত করে এনেছিল, যার ফলে একটি সরকারি মেডিকেল কলেজে সুযোগ পাওয়া তাঁর হাতের নাগালে চলে এসেছিল।

এরপর এ বছরের মে মাসে আসে তাঁর তৃতীয় প্রচেষ্টা। কিন্তু প্রশ্ন ফাঁস হওয়ার কারণে পরীক্ষা বাতিল করে পুনরায় পরীক্ষা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়—যার অর্থ প্রদীপকে চতুর্থবারের মতো নিট পরীক্ষায় বসতে হতো।

ততদিনে তাঁর জীবন হয়ে উঠেছিল দৈনিক ১৬ ঘণ্টার এক কঠোর চক্র: ভোর ৪টা ৩০ মিনিটে ঘুম থেকে ওঠা, কোচিং, রাত ৯টা পর্যন্ত নিজে নিজে পড়াশোনা, ঘুম এবং আবারও একই রুটিন। জীবন থেকে বিনোদনের সবকিছুই বাদ পড়ে গিয়েছিল।

প্রদীপ এমনকি নিজের একটি মোবাইল ফোন পর্যন্ত ব্যবহার করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিল।

সে তাঁর বাবাকে বলত, ‘সুযোগ পাওয়ার পর আমি মোবাইল কিনব, ফোন আমাকে অন্যমনস্ক করে।’

তাঁর একমাত্র শখ ছিল সিকার এবং বাড়ির যাতায়াতের পথে ফুটপাতের দোকান থেকে সস্তায় কেনা প্রায় ১০টি হাতঘড়ির এক সংগ্রহ।

গত ৩ মে পরীক্ষা শেষে সে হাসিমুখে বের হয়ে আসে।

সে তাঁর বাবাকে বলেছিল, ‘এবার আমার সুযোগ পাওয়া নিশ্চিত।’

পরিবারটি সিকার ছেড়ে গ্রামে ফিরে উদযাপন করার পরিকল্পনা করছিল। কিন্তু তখনই প্রশ্ন ফাঁসের খবরটি সামনে আসে।

প্রদীপ শান্তভাবে তাঁর বাবাকে বলেছিল, ‘আমাদের আবার প্রস্তুতি নিতে হবে।’

১৫ মে সকালে রাজেশ চার বছর ধরে যা করে আসছেন তা-ই করলেন। সকালের বাসে করে সিকারে প্রদীপের জন্য দুধ ও ঘরে তৈরি দই পাঠিয়ে দিলেন।

প্রদীপ ফোন করে জানিয়েছিল যে দই ও দুধ এসে পৌঁছেছে।

ছেলে প্রদীপের পড়াশোনার খরচ জোগাতে জমি বিক্রি করেন এবং ব্যাংক থেকে ঋণ নেন রাজেশ কুমার। ছবি: রয়টার্স

সে তার বোনকে বলেছিল, ‘তুমি গিয়ে গোসল করে নাও। ফিরে আসলে আমরা রান্না করব।’

আধ ঘণ্টা পর বোন যখন ফিরে আসলেন, তখন দরজা ভেতর থেকে বন্ধ ছিল। ওই সামান্য সময়ের মধ্যেই তাঁর ভাই নিজের জীবন প্রদীপ নিভিয়ে দিয়েছিলেন।

রাজেশ বলেন, ‘সে আমাকে কখনো কিছু বলেনি। ওকে দেখে সুখী মনে হতো।’

প্রশ্ন ফাঁসের কথা বলতে গিয়ে রাজেশের কণ্ঠ রূঢ় হয়ে ওঠে।

তিনি বলেন, ‘আমি জমি বিক্রি করে ওকে পড়িয়েছিলাম। যাদের টাকা আছে তারা প্রশ্নপত্র কেনে, আর যারা সততার সাথে পড়াশোনা করে তারা পেছনে পড়ে থাকে।’

এরপর তিনি এমন একটি কথা বলেন যা তাঁকে অনবরত কুড়ে কুড়ে খাচ্ছে।

রাজেশ বলেন, ‘সরকার আমার ছেলেকে কেড়ে নিয়েছে। যদি প্রশ্ন ফাঁস না হতো, প্রদীপ আজ বেঁচে থাকত এবং সে আনন্দ করত।’

কাহান এবং প্রদীপ এসেছিলেন ভারতের দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন সামাজিক স্তর থেকে।

একজন ছিলেন আইনজীবীর ছেলে যিনি দুই শহরে সচ্ছল জীবন কাটিয়েছেন। অন্যজন ছিলেন এক প্রান্তিক কৃষকের ছেলে যিনি সন্তানের শিক্ষার জন্য নিজের ভবিষ্যৎ বন্ধক রেখেছিলেন। একজন নিটের পর ডিজনিল্যান্ডে যাওয়ার স্বপ্ন দেখতেন। অন্যজন ডাক্তার হওয়ার আগে একটি মোবাইল ফোন পর্যন্ত কেনা স্থগিত রেখেছিলেন।

অথচ এই দুই বাবাই আজ একই প্রশ্ন তুলছেন: যে সন্তানরা বিশ্বাস করত যে তারা নিজেদের যোগ্যতায় ভবিষ্যৎ গড়ে নেবে, তারা কীভাবে এমন একটি ব্যবস্থার ওপর বিশ্বাস হারিয়ে ফেলল যা তাদের পুরস্কৃত করার কথা ছিল?

কাহানের শেষকৃত্যের পর বেশ কয়েক সপ্তাহ ধরে প্রশান্ত প্যাটেল গভীর শোকের সাগরে নিমজ্জিত ছিলেন।

যা তাকে শেষ পর্যন্ত শোক থেকে বের করে এনেছিল, তা হলো প্রতিবাদী শিক্ষার্থীরা। তিনি গত জুলাইয়ে তাদের আন্দোলনে যোগ দিতে দুইবার দিল্লি সফর করেন।

তিনি বলেন, ‘আমি কোনো ক্ষতিপূরণের জন্য সেখানে যাইনি, আমি জবাবদিহিতা চেয়েছিলাম।’

টানা কয়েক সপ্তাহের আন্দোলনের মুখে গত ২৫ জুলাই অবশেষে পদত্যাগ করতে বাধ্য হন শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান। সরকার আত্মহত্যা করা শিক্ষার্থীদের পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা প্রকাশ করেছে এবং ‘আইন ও বিধি অনুযায়ী সর্বোচ্চ ক্ষতিপূরণ’ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।

তবে প্রশান্ত প্যাটেলের কাছে এই আন্দোলনের আসল অর্জন ছিল অন্য জায়গায়।

তিনি গত ২০ জুলাই পুলিশের কঠোর অ্যাকশনের পরও শিক্ষার্থীদের রাজপথে ফিরে আসতে দেখেছিলেন।

তিনি বলেন, ‘আমি তাদের ধন্যবাদ জানাতে চেয়েছিলাম কারণ তারা কাহানের কণ্ঠস্বরে পরিণত হয়েছিল। এই শিশুরা মার খাওয়ার পরও যদি ফিরে এসে ন্যায়বিচারের জন্য লড়াই করতে পারে, তবে তা আমাকেও শক্তি যোগায়।’

তাঁর ছেলে নিজের সেই কণ্ঠস্বর খুঁজে পায়নি।

তিনি বলেন, ‘কাহান নিজের ক্ষোভ প্রকাশ করেনি। বরং সে নিজের জীবন কেড়ে নিয়েছে।’

তিনি একটু থামলেন।

তারপর বলেন, ‘কিন্তু বাকি শিশুরা আওয়াজ তুলেছে।’

এরপর তিনি এমন কিছু কথা বলেন যা প্রতিটি অভিভাবক এবং প্রতিটি সরকারের শোনা উচিত।

তিনি বলেন, ‘আমাদের দায়িত্ব হলো তরুণরা নীরব হয়ে যাওয়ার আগেই তাদের কণ্ঠস্বর শোনা।’