কুকুর না বিড়াল? পূর্ব এশিয়ায় বাড়ছে বিড়ালপ্রেমী
হংকংয়ের বাসিন্দা এলেন চুং সিএনএনকে বলেন, ‘শহরে বিড়াল পোষা অনেক বেশি সুবিধাজনক। কারণ, কুকুরকে বারবার বাইরে হাঁটতে নিয়ে যেতে হয়, কিন্তু সবার এত সময় থাকে না। আবার অনেকেই কুকুর ভয় পায়।’
কুকুর না বিড়াল? পূর্ব এশিয়ায় বাড়ছে বিড়ালপ্রেমী
হংকংয়ের বাসিন্দা এলেন চুং সিএনএনকে বলেন, ‘শহরে বিড়াল পোষা অনেক বেশি সুবিধাজনক। কারণ, কুকুরকে বারবার বাইরে হাঁটতে নিয়ে যেতে হয়, কিন্তু সবার এত সময় থাকে না। আবার অনেকেই কুকুর ভয় পায়।’
এটা অনেক পুরোনো একটা প্রশ্ন—আপনি বিড়াল পছন্দ করেন, নাকি কুকুর?
তবে পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর দিকে তাকালে মনে হবে, আজকাল বেশির ভাগ মানুষই ‘টিম ক্যাট’ বা বিড়ালের দলে যোগ দিচ্ছেন।
উদাহরণ হিসেবে তাইওয়ানের কথাই ধরা যাক। সরকারি এক জরিপ অনুযায়ী, এই দ্বীপে ২০২৫ সালে প্রথমবারের মতো পোষা কুকুরের চেয়ে বিড়ালের সংখ্যা বেড়ে গেছে। সেখানে পোষা বিড়ালের সংখ্যা দ্রুতগতিতে বেড়েছে। ২০২৩ সালে যেখানে বিড়ালের সংখ্যা ছিল ১৩ লাখ, গত বছর তা প্রায় ৩৩ শতাংশ বেড়ে ১৭ লাখে দাঁড়িয়েছে।
২০২১ সালে চীনেও একই ঘটনা ঘটেছিল। তবে এই প্রথার হয়তো সবচেয়ে পুরোনো প্রবর্তক জাপান, যেখানে এক দশক আগেই কুকুরের জায়গা দখল করেছিল বিড়াল। এমনকি দক্ষিণ কোরিয়া বা হংকংয়ের মতো যেসব জায়গায় এখনো কুকুর বেশি জনপ্রিয়, সেখানেও বিড়ালের জনপ্রিয়তা ক্রমশ বাড়ছে।
এই সবগুলো অঞ্চলের মধ্যে কিছু সাধারণ মিল রয়েছে: জনবহুল শহরের ছোট ছোট অ্যাপার্টমেন্টে মানুষের বসবাস, একাকিত্ব এবং ব্যস্ত কর্মজীবন—যার কারণে পোষা কুকুরকে সময় দেওয়া তাদের জন্য বেশ কঠিন হয়ে পড়ে।

চলছে বিড়ালের প্রদর্শনী। ছবি: রয়টার্স
হংকংয়ের বাসিন্দা এলেন চুং সিএনএনকে বলেন, ‘শহরে বিড়াল পোষা অনেক বেশি সুবিধাজনক। কারণ, কুকুরকে বারবার বাইরে হাঁটতে নিয়ে যেতে হয়, কিন্তু সবার এত সময় থাকে না। আবার অনেকেই কুকুর ভয় পায়।’
জামা-কাপড় পরা বিড়ালের উপস্থিতিতে জমজমাট এক ক্যাট ক্যাফেতে বসে তিনি আরও বলেন, ‘আমার তো মনে হয় বিড়ালগুলো দেখতেও বেশি আদুরে।’
হংকং বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক এবং থেরাপি প্রাণী নিয়ে কাজ করা ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট পল ওং বলেন, ‘মানুষ এখন আর সন্তান নিতে চায় না। তাই পোষা প্রাণী লালন-পালন করাটা এখন অনেকটা সন্তান লালন-পালনের মতোই হয়ে গেছে।’
ক্লান্তি, ব্যস্ততা আর একাকিত্ব
বিড়াল পোষার এই বর্তমান জোয়ারের পেছনে এসব অঞ্চলের কোনো কোনো দেশের ‘ক্যাট ম্যানিয়া’ বা বিড়ালপ্রীতির পুরোনো ইতিহাসও ভূমিকা রাখছে।
যেমন, হ্যালো কিটির জন্মস্থান হলো জাপান। ১৯৭৪ সালে তৈরি হওয়া এই ছোট্ট কার্টুন বিড়ালের চরিত্রটি এখন ৮০ বিলিয়ন ডলারের এক বিশাল সাম্রাজ্য। এ ছাড়া জাপানে বেশ কয়েকটি ‘ক্যাট আইল্যান্ড’ বা বিড়ালের দ্বীপও রয়েছে। এসব দ্বীপ এখন জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।
তবে অন্য জায়গাগুলোতে বিড়ালদের অতটা সমাদর ছিল না। বহু বছর ধরে দক্ষিণ কোরিয়ার মানুষ বিড়ালকে অশুভ বিষয়বস্তুর সঙ্গে মেলাত। ঐতিহাসিকভাবে কুকুরের তুলনায় সেখানে বিড়ালের জনপ্রিয়তা কম হওয়ার এটি অন্যতম কারণ।
তবে ধীরে ধীরে সেই ধারণাও পাল্টাচ্ছে। কেবি ফিন্যান্সিয়াল গ্রুপের ২০২৫ সালের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, কোভিড-১৯ মহামারির পর থেকে দক্ষিণ কোরিয়ায় পোষা বিড়ালের সংখ্যা দ্রুত বেড়েছে। কোভিড বিধিনিষেধের কারণে কয়েক বছর ধরে বাইরের কার্যকলাপ সীমিত থাকায়, ঘরের ভেতরে বিড়ালের যত্ন নেওয়া সহজ ছিল বলেই হয়তো এই বৃদ্ধি।
দক্ষিণ কোরিয়ার উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় শহর হওয়াসং-এর ‘ব্যালিওমারু ক্যাট অ্যাডপশন সেন্টারের’ পশুচিকিৎসক গং সু-হিউন সিএনএনকে বলেন, ‘বিড়ালের প্রতি মানুষের আগ্রহ যে বাড়ছে, তা আমি বুঝতে পারছি।’ তিনি জানান, আগের তুলনায় এখন আরও বেশি মানুষ পোষা প্রাণী হিসেবে বিড়ালকে বেছে নিচ্ছেন এবং স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ করতে আসছেন।

ছবি: রয়টার্স
হংকং বিশ্ববিদ্যালয়ের ওং বলেন, গত এক দশকে সবচেয়ে বড় যে পরিবর্তন এসেছে, তা হলো মানুষের মানসিকতায়। আগে প্রাণীদের শুধু কাজের জন্য ব্যবহার করা হতো, কিন্তু এখন এদের ‘সঙ্গী’ হিসেবে ভাবা হয়। উদাহরণ হিসেবে তিনি বলেন, আগে কুকুরকে মূলত নিরাপত্তা বা অন্য কোনো কাজের জন্য এবং বিড়ালকে ইঁদুর বা পোকামাকড় দমনের জন্য ব্যবহার করা হতো। কিন্তু এখন একাকিত্ব দূর করতে এদের পোষা হয়।
সাম্প্রতিক দশকগুলোতে পূর্ব এশিয়ার অনেক জায়গাতেই জনসংখ্যা ও সামাজিক প্রথায় বিশাল পরিবর্তন এসেছে। চীন, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়াজুড়ে তরুণরা কাজের সন্ধানে দলে দলে গ্রাম ছেড়ে বড় শহরগুলোতে পাড়ি জমাচ্ছেন। ফলে গ্রামগুলো জনশূন্য হয়ে পড়ছে এবং সেখানে কেবল বয়স্করাই থাকছেন।
কিন্তু শহরের জীবনেরও নিজস্ব চ্যালেঞ্জ আছে। পূর্ব এশিয়ার অনেক তরুণকে এখন চরম প্রতিযোগিতাপূর্ণ চাকরির বাজার, কম বেতন, জীবনযাত্রার উচ্চ ব্যয় এবং অমানবিক কর্মঘণ্টার সঙ্গে লড়তে হচ্ছে।
চীনে অতিরিক্ত কাজের সংস্কৃতি এত বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছিল যে ২০২১ সালে দেশটির সর্বোচ্চ আদালত এর কড়া সমালোচনা করেন। একইভাবে জাপানে ‘অতিরিক্ত পরিশ্রমে মৃত্যু’ বোঝাতে একটি নির্দিষ্ট শব্দই রয়েছে, যেখানে সরকার এখন ওভারটাইমের ওপর আইনি সীমা আরোপ করেছে।
হংকং শু ইয়ান বিশ্ববিদ্যালয়ের কাউন্সেলিং এবং সাইকোলজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক জো এনগাই বলেন, ‘এই পরিস্থিতি বিড়ালকে একটি বাস্তবসম্মত বিকল্পে পরিণত করেছে, বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের কাছে। যেহেতু বিড়াল ঘরের পরিবেশে ভালোভাবে মানিয়ে নেয় এবং তাদের রোজ বাইরে হাঁটতে নিয়ে যাওয়ার দরকার হয় না, তাই হংকংয়ের মতো জায়গায় এ ধরনের প্রাণীই মানুষের জন্য বেশি জুতসই।’
অন্যান্য বিভিন্ন কারণের পাশাপাশি উল্লিখিত এসব চাপের জন্য এশিয়ার তরুণরা ক্রমশ বিয়ে বা সন্তান নেওয়ার সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসছেন। জাপানের জনসংখ্যা টানা ১৬ বছর ধরে কমছে, আর দক্ষিণ কোরিয়ায় সন্তান জন্মদানের হার বিশ্বের সবচেয়ে কম। পুরো অঞ্চলজুড়েই একই চিত্র দেখা যাচ্ছে।
কিন্তু এক সদস্যের পরিবারের সংখ্যা যত বাড়ছে, একাকিত্বও তত বাড়ছে। কিছু তরুণ দীর্ঘ সময়ের জন্য সমাজ থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছেন, যা ‘হিকিকোমোরি’ নামে পরিচিত। দক্ষিণ কোরিয়ার রাজধানী সিউলে একাকিত্ব দূর করতে সরকার পাঁচ বছর মেয়াদি একটি প্রকল্পে প্রায় ৩২৭ মিলিয়ন ডলার ব্যয় করছে। আর চীনে ‘আর ইউ ডেড’ (তুমি কি মরে গেছ?) নামের একটি অ্যাপ সম্প্রতি ভাইরাল হয়েছিল, যেখানে ব্যবহারকারীদের প্রতিদিন ‘চেক ইন’ করে জানাতে হতো যে তারা বেঁচে আছেন।

ছবি: রয়টার্স
ফুলেফেঁপে উঠছে পেট ইকোনমি
সঙ্গী, সন্তান বা মানুষের সঙ্গ না পেয়ে অনেকেই এখন প্রাণীদের দিকে ঝুঁকছেন। আর এর পেছনে তারা দুই হাতে টাকাও খরচ করছেন, যার ফলে এশিয়ায় ‘পোষা প্রাণীর অর্থনীতি’ (পেট ইকোনমি) ফুলেফেঁপে উঠছে।
বিনিয়োগ ব্যাংক গোল্ডম্যান স্যাকস-এর ২০২৪ সালের এক গবেষণা প্রতিবেদনে দেখা যায়, চীনে পোষা প্রাণীর খাবার এখন অন্যতম দ্রুত বর্ধনশীল একটি পণ্য। ২০৩০ সালের মধ্যে এই শিল্পের মূল্য ১২ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাবে বলে আশা করা হচ্ছে।
দেশটির বৃহত্তম অনলাইন মার্কেটপ্লেসের তথ্যমতে, ২০২৩ সালে দক্ষিণ কোরিয়ায় প্রথমবারের মতো শিশুদের স্ট্রলারের (বাচ্চাদের বহন করার গাড়ি) চেয়ে পোষা প্রাণীর স্ট্রলার বেশি বিক্রি হয়েছে।
যেসব সরকার দেশে জন্মহার বাড়াতে মরিয়া, তাদের কাছে এসব খবর মোটেও সুখকর নয়। তবে সন্তানের অভাব পূরণে একটি আদুরে বিড়াল হয়তো এশিয়ার তরুণদের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয় মানসিক স্বস্তি নিয়ে আসতে পারে।
হংকং বিশ্ববিদ্যালয়ের ওং বলেন, ‘এর মাধ্যমে যদি মানুষের মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নতি হয়, তবে একটি ছোট ও বিষণ্ন জনসংখ্যার চেয়ে এটি অন্তত ভালো।’