অতীত-ভবিষ্যৎ
অতীত-ভবিষ্যৎ
ভবিষ্যতের চিন্তায় বর্তমান অসার করার দৌড়ে কোনো প্রতিযোগিতা যদি থাকত, তার প্রথম পুরস্কার আমি ছাড়া আর কেউ পেলে ভীষণ না-ইনসাফি হয়ে যেত।
নীরার বিয়ে। হুমায়ূন আহমেদের বেশ কিছু গল্পে মুখ্য নারীর চরিত্রে যে থাকত, তার নাম হতো নীরা। কী করে হলো জানি না, আমার জীবনের সে চরিত্রের মেয়েটির নামও নীরা। জীবনটা অনেকখানিক গল্পের মতোই হয়ে আছে। আগামী বছর তার বিয়ে ঠিক হয়েছে। হাতে ধরে গুনে আমার কাছে এখনো তিনশো তেষট্টি দিন আছে। তবে প্রতিটা দিনই যেন এক বছরের মতো করে কাটছে।
তবে এক বছরে যতটা বড় আমার হয়ে যাওয়ার কথা, ততটা আমি হচ্ছি না। তবে আজকাল মা বলে উঠেন আমি নাকি দিনে দিনে বুড়িয়ে যাচ্ছি। বুঝলাম, সম্ভ্রমে বড় না হলেও, শারীরিক ভাবে সেই পাটটা প্রতিদিন বছর নাগাদ করেই চুকছে।
মায়ের কথা যে কতটুকু গুরুতর তা গতকালের আগ পর্যন্ত টের পাইনি। রাস্তা ধরে হাঁটছি, পাশে এক খেলার মাঠ। এমন সময় কোন এক জা’গা থেকে জানি না কখন বল এসে পড়লো পায়ের সামনে, সেই উষ্ঠো খেয়ে পড়ে গেলাম। আশে পাশে বেশ কিছু মানুষ ছিলো। লজ্জা পেলাম। উঠে দেখলাম বলটা তাও ফুটবলের না, প্লাস্টিকের হাওয়ায় ফোলানো বল। এই বলের ছোয়াতেই কিভাবে যেন পড়ে গেছি। পাশের থেকে এক ষাটোর্ধ লোক বলে উঠলো, ‘কি মিয়া, এই বয়সে বুড়ায় গেলে চলবো? গায়ে জোর না থাকলে হইবো?’ এই বলে সে তার হাত বাকিয়ে খিরখিরে পেশিগুলো দেখানো শুরু করলো। পাশের সবাই খ্যাক করে হেসে দিলো। ভীষণ রাগ ধরলো। মনে করলো ব্যাটাকে পেটাই। এতদিন ধরে মা বললো, গায়ে মাখিনি। এজন্যে রাস্তার মামার কথা তো না মাখিয়ে উড়াল দিয়ে পালাতে পারি না।
গায়ের রাগ সংযম করতে পারলাম। যেভাবে একটু আগে প্লাস্টিকের বলে পড়ে চিৎপটাং হয়েছি, ওনাকে মারতে গেলে নিজে মার খেয়ে আসব, তার সম্ভাবনাও ফেলে আসতে পারছি না। তবে কী করে জানি মুখের রাগ দমিয়ে রাখতে পারলাম না। মামা-খালার দুটো গালি দিয়ে বাড়ি ফিরলাম।
এ নিয়ে আমি বিশাল চিন্তিত। তাই দু’দিন ধরে হানি-নাটস খাওয়া ধরেছি। আশা করছি কিছু একটা ব্যবস্থা করতে পারবো। নীরার বিষয়টাও দেখতে হবে। আজ তার সাথে আমার বাইরে বের হওয়ার কথা। সে বলেছে সে আমার সাথে আর বাইরে বেরোবে না। খুব জোর করে তাকে বার করিয়েছি। সে প্রথমে কোন মতেই মানছিলো না তবে পরে হঠাৎ কি করে যেন রাজি হয়ে গেল।
নীরার সাথে বসে আছি। বুঝতে পারছি সে কেন রাজি হয়েছে। তার বিয়ে ভেঙে গেছে। মনের ভেতরটা খুলে দেখা গেলে বোঝা যেত আমি নাচছি, কিন্তু বাহিরে সংবরণ রেখে আছি। মুচকি হাসি দিচ্ছি, চায়ে চুমুক দিচ্ছি। হাওয়ার বেগ পরখ করছি।
নীরাকে বলে উঠলাম, দেখি দেখাও দেখি এবার সেই ছেলের ছবি। গতবার সে ছবি আমি দেখিনি রাগে, এবার রাগ নেই। ছেলেকে দেখে দু’গাল হাসবো এই যা উদ্দেশ্য।
নীরা একটু বিরক্ত হলো। তবে না করলো না। ছবিতে দেখলাম এক বিদঘুটে দেখতে ছেলে সাদা পাঞ্জাবি পড়ে বসে আছে। দাড়ি কামাই করেছে যেন সিনেমার অভিনেতা। দেখেই বিরক্তি লেগে গেল। তবে চোখ আটকালো সেই অভিনেতার পাশের লোকের ওপর। জিজ্ঞেস করলাম, উনি কে? নীরা বললো, আমার বাবা।
তাকিয়ে দেখছি। তার বাবা নির্দেশক সেই লোকটা আমার সেই মামা, যাকে সেদিন মামা-খালার গালি দিয়ে এসেছি।
অতীতের চিন্তায় বর্তমান অসার করার দৌড়ে কোন প্রতিযোগিতা যদি থাকতো, তার প্রথম পুরস্কার আমি ছাড়া আর কেউ পেলে ভীষণ না-ইনসাফী হয়ে যেত..