একটু চালাক না হলে কি হয়?
ছোটবেলায় পরীক্ষা দিতে ওরকম ভালো লাগত না। তাও আম্মু জোর করে পরীক্ষা দিতে এদিক সেদিক পাঠিয়ে দিতেন। কোনোমতে ঠেলেঠুলে পড়াশোনা করতাম, আর ভাবতাম, “এই তো কালকের দিনটা, পরীক্ষা দিলেই শেষ ঝামেলা, একটু ভালো করে পড়ি, এই তো আর একটা দিন।” যা হাতের সামনে পেতাম, ঐটাই মনে হতো পরীক্ষায় আসবে।
একটু চালাক না হলে কি হয়?
ছোটবেলায় পরীক্ষা দিতে ওরকম ভালো লাগত না। তাও আম্মু জোর করে পরীক্ষা দিতে এদিক সেদিক পাঠিয়ে দিতেন। কোনোমতে ঠেলেঠুলে পড়াশোনা করতাম, আর ভাবতাম, “এই তো কালকের দিনটা, পরীক্ষা দিলেই শেষ ঝামেলা, একটু ভালো করে পড়ি, এই তো আর একটা দিন।” যা হাতের সামনে পেতাম, ঐটাই মনে হতো পরীক্ষায় আসবে।
কথায় আছে, পরীক্ষার পড়া কখনো শেষ হয় না। ঠিক তাই, যতই পড়তাম, পড়া আরও বেড়ে যেত। তখন বুঝিনি, পড়াশোনার একটা বিকল্প ব্যবস্থাও আছে, যেখানে পড়া শেষ হওয়ার জন্য অপেক্ষা করতে হয় না, বরং প্রশ্নই পড়ুয়ার কাছে চলে আসে।
শেষমেশ পরীক্ষার দিন আসলে সেই সকালবেলা উঠে পরীক্ষা দিতে যেতাম। বুকের মধ্যে কী দুরুদুরু ভয়, এত পড়লাম, পরীক্ষাটা আসলে কেমন হবে? এখন অবশ্য বুঝি, আমার ভয় পাওয়ার কোনো কারণ ছিল না, কারণ আমি শুধু পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম, পরীক্ষাটাকে নিজের সুবিধামতো চালানোর প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম না।
বরাবর পরীক্ষার সময় দেখতাম, একদল পরীক্ষার আগে পর্যন্ত ভূতের মতো পড়তে থাকত। কয়েকটা গল্প বলি, হয়তো তাদের ভালো রেজাল্ট করার ইচ্ছা থেকে কিছু বুঝতে পারবেন, বিশেষ করে যারা এখনও মনে করেন, ভালো রেজাল্ট করার জন্য ভালো করে পড়তে হয়।
তো, যখন আমি ক্লাস নাইন কি টেনে, তখন এক কোচিং সেন্টারে পরীক্ষা দিতাম। আমি আবার শুরুর ব্যাচেই পরীক্ষা দিতাম, কারণ দেরি করে পরীক্ষা দিলে পড়া ভুলে যাই। কিন্তু আমার সহপাঠীরা কত ভালো ছিল জানেন, ওরা আমাদের শুরুর ব্যাচের পরীক্ষা শেষ হওয়ার জন্য বসে থাকত। আমরা বের হলে আমাদের কাছ থেকে প্রশ্ন জেনে নিয়ে আরও কতক্ষণ পড়ত।
আপনারা বলতে পারেন, পরীক্ষার আগে প্রশ্ন জেনে এভাবে পড়া কি ঠিক? কিন্তু ওদের লজিকটা ভেবে দেখুন, যদি এটাই পরীক্ষার প্রশ্ন হয়, আর এটাই যদি ওরা ভালোভাবে উত্তর করতে পারে, আর ভালো মার্ক পায়, তাহলে কি এর অর্থ এটাই না যে ওদের জ্ঞানের যাচাই ঠিকমতো হচ্ছে?
মার্ক ভালো পাওয়াটাই কি মূল উদ্দেশ্য নয়? প্রশ্নপত্র ফাঁসের মতো গুরুতর অভিযোগ তুলে শিক্ষার্থীদের মনোবল ভেঙে দেওয়ার আগে আমাদের ভাবা উচিত, তাঁরা অন্তত প্রশ্নের উত্তরগুলো তো জানেন, আর উত্তর জানার চেয়ে বড় যোগ্যতা আর কী হতে পারে?
আমার মনে আছে, আমার এক বান্ধবী ছিল, নামখানা না হয় নাই বললাম। একদিন ক্লাস টেনের সমাজের অর্থনীতির ওপর পরীক্ষা। তো আমি বসে পরীক্ষা দিচ্ছিলাম। ঐ কোচিংয়ে আবার যে যখন মন চায় এসে পরীক্ষা দিয়ে যেতে পারত। আমার এই বান্ধবীর কোচিংয়ের টিচারদের সাহায্য করার জন্য যে আপুটা ছিল, তাঁর সঙ্গে বেশ ভালো সম্পর্ক ছিল। তো সে একবার আমাদের ঐ পরীক্ষার প্রশ্ন নিয়ে বাইরে চলে গেল। কতক্ষণ পর আবার ফেরত এসে বলল, “নাহ আপু, পরীক্ষাটা দিয়েই যাই।” এই বলে সে আমার পাশে বসে জিজ্ঞেস করল, “কীরে, কেমন আছিস?” আমি উত্তর দেওয়ার আগেই বলল, “আচ্ছা, আগে তোর খাতাটা একটু খুলে বস তো, আমার কয়েকটা জিনিস মনে পড়ছে না।”
এমনই থতমত খেলাম যে আসলেই পরীক্ষার খাতা খুলে বসলাম, আর এভাবে তার আসলে কতটুকু মনে ছিল, সেটা আমি বুঝলাম না। তবে এটা মনে আছে, প্রতি পেজ লেখার পর সে একবার করে তার লিপগ্লস ঠিক করত, আর আমাকে জিজ্ঞেস করত, “আর কতক্ষণ লাগবে তোর এই পেজ লিখে শেষ করতে?” আমি উত্তর দিতে পারতাম না, কারণ নিজের পরীক্ষা দেওয়ার পাশাপাশি অন্যের পরীক্ষার প্রস্তুতিতে সহযোগিতা করাটাও যে শিক্ষাজীবনের একটা গুরুত্বপূর্ণ দক্ষতা, সেটা তখনও শিখিনি।
মোদ্দা কথা হলো, ঐ পরীক্ষায় আমার বান্ধবী আর আমার মার্কের পার্থক্য ছিল মাত্র দুই মার্ক। বুঝলাম না, কম কেন পেলাম। এখন অবশ্য বুঝি, আমার বান্ধবীর সঙ্গে আমার পার্থক্য ছিল শুধু প্রস্তুতির পদ্ধতিতে, আর আমাদের পরীক্ষক সেই পদ্ধতির কোনো পার্থক্য খাতায় দেখতে পাননি।
নম্বর দেওয়ার সময় উত্তর ঠিক থাকলেই হলো, উত্তরটা মাথা থেকে এসেছে, পাশের খাতা থেকে এসেছে, নাকি অন্য কোনো বিশেষ উৎস থেকে, সেটা যাচাই করার দায়িত্ব নিশ্চয়ই পরীক্ষকের নয়। পরীক্ষকের কাজ নম্বর দেওয়া, গোয়েন্দাগিরি করা নয়, আর কর্তৃপক্ষের কাজ পরীক্ষা নেওয়া, পরীক্ষা যাতে ঠিকমতো নেওয়া যায় সেই ব্যবস্থা করা নয়, এমনটা ভাবার কোনো কারণ নেই।
যাই হোক, কোচিংয়ের পরীক্ষা ভেবেও বা কী লাভ? এসএসসির দিকে যাই, কারণ সরকারি ব্যবস্থায় নিশ্চয়ই এসব হওয়ার কোনো সুযোগ নেই।
আমার সিট পড়েছিল এক সরকারি স্কুলে। পরীক্ষার সময় গেট খোলার সঙ্গে সঙ্গেই আম্মু আমাকে ঠেলে হলে পাঠিয়ে দিতেন। কিন্তু যতক্ষণ বাইরে থাকতাম, দেখতাম, আমার বান্ধবীরা একটা নির্দিষ্ট সময়ের পরে বিশাল বড় মাইক্রোবাসের ভিতরে বসে একসঙ্গে কিছু একটা মুখস্থ করত। ভাগ্যবশত একেবারে শেষ পরীক্ষার দিনেই ওদের প্রস্তুতি দেখার সুযোগ হয়েছিল। ওমা, এরা দেখি সব এমসিকিউ মুখস্থ করে! কত ভালো ভাই, পরীক্ষার আগেও বসে বসে নতুন জিনিস মুখস্থ করছে, এমন পরিশ্রমী শিক্ষার্থী দেশের সম্পদ হওয়া উচিত। আম্মু আবারও যথারীতি দাঁড়াতে না দিয়ে আমাকে ঠেলে পরীক্ষার হলের দিকে পাঠিয়ে দিলেন।
পরীক্ষার আগে খুব দুশ্চিন্তা হলো। আচ্ছা, ওরা তো এতক্ষণ পড়ে, আমি তো এত পড়লাম না। অথচ পরীক্ষা শুরু হওয়ার পর গিয়ে দেখি, ওরা যা প্রশ্ন নিয়ে খাতার মার্জিন টানতে টানতে বলছিল, ওটাই এসে বসে আছে। ওমা, এ দেখি আচানক কারবার!
এটা কীভাবে সম্ভব? নিশ্চয়ই ওদের অসাধারণ মেধা, অথবা প্রশ্নপত্র প্রণয়নকারীদের সঙ্গে ওদের চিন্তাভাবনার আশ্চর্য মিল ছিল। আমাদের দেশের মেধাবীরা যে পরীক্ষার আগেই পরীক্ষার প্রশ্নের সঙ্গে এত সুন্দরভাবে মানিয়ে নিতে পারে, তা সত্যিই প্রশংসার বিষয়।
শুধু প্রশ্নপত্রের গোপনীয়তা রক্ষার দায়িত্বে থাকা মানুষগুলোর সঙ্গে এই মেধার মিলটা কীভাবে হলো, সেটা নিয়ে বেশি ভাবতে নেই।
পরীক্ষা শেষ হওয়ার পর ওদের জিজ্ঞেস করলাম, “কীরে, তোরা এসব প্রশ্নই যে আসবে কীভাবে বুঝলি?” ওরা খালি হেসেই গেল, আমি আর উত্তর পেলাম না। তখন বুঝিনি, কিছু উত্তর না পাওয়াও একটা উত্তর, বিশেষ করে যখন উত্তরটা জানলে অনেকের চাকরি, সম্মান আর দায়িত্ববোধ নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠতে পারে।
আজকে পত্রিকার পাতায় দেখলাম, সরকারি এক পরীক্ষা বাতিল করে দেওয়া হয়েছে। আচ্ছা, বুঝলাম, প্রশ্ন ফাঁসের কারণে পরীক্ষা বাতিল করা ঠিকই আছে।
প্রশ্ন ফাঁস কে আটকাতে পারে বলুন? বাংলাদেশে এসব তো হতেই পারে, এটাই স্বাভাবিক। বরং পরীক্ষাটা বাতিল যে হয়েছে, এটাই কি অনেক না? কর্তৃপক্ষ অন্তত প্রমাণ করেছেন, তাঁরা প্রশ্ন ফাঁসের পর ব্যবস্থা নিতে পারেন, যদিও প্রশ্ন ফাঁসের আগে ব্যবস্থা নেওয়াটা তাঁদের কাজের মধ্যে পড়ে কি না, সে বিষয়ে আমি নিশ্চিত নই। একটা পরীক্ষা বাতিল করতে পারা যদি দায়িত্বশীলতার প্রমাণ হয়, তাহলে বারবার পরীক্ষা বাতিলের প্রয়োজন হওয়াটা নিশ্চয়ই দায়িত্বশীলতার আরও বড় প্রমাণ। এমন দক্ষতার জন্য আলাদা পদক থাকা উচিত, কারণ পরীক্ষা নেওয়ার চেয়ে পরীক্ষা বাতিল করার অভিজ্ঞতা অর্জন করাও তো সহজ কথা নয়।
আচ্ছা, হয়তো আমার চিন্তাই ভুল। কিন্তু এই যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক বেঞ্চে লেখা অনেকগুলো উত্তরের ছবি ঘুরে বেড়াচ্ছে, এটাও তো একধরনের মেধার পরিচয়। আমি আজ দুই দিন ধরে আমার এক কোর্সের চল্লিশ পিনের ডায়াগ্রাম মুখস্থ করতে পারছি না। এই যে এভাবে যেই প্রার্থী এত কিছু মুখস্থ করলেন, আমাকে বলুন, উনি কি কখনো কর্মক্ষেত্রের কোনো কাজ ভুলবেন? না, মোটেও না।
উনি প্রশ্ন পেয়েছেন, মুখস্থ করেছেন, উত্তর ভুলে যাবেন বলে আবার কষ্ট করে লিখেও রেখেছেন। এই পর্যায়ের প্রস্তুতি, নিষ্ঠা আর তথ্য সংরক্ষণের দক্ষতা কয়জনের আছে বলুন? শুধু একটা ছোট সমস্যা, এই দক্ষতাগুলো যদি চাকরিতে ঢোকার আগেই কাজে লাগে, তাহলে চাকরিতে ঢোকার পরে আর কাজ শেখার দরকারটা কী?
তবে হ্যাঁ, যাতায়াত খরচ, এতজন চাকরিপ্রার্থীর সময় নষ্ট হওয়া, মাসের পর মাস প্রস্তুতি নেওয়া মানুষের আবার নতুন করে অনিশ্চয়তায় পড়া, সব মিলিয়ে ব্যাপারটা বেশ দুঃখজনকই হয়ে গেল। কিন্তু তাঁদের কষ্টের দায়টা কার? পরীক্ষার্থীরা তো শুধু পরীক্ষা দিতে এসেছিলেন, প্রশ্ন ফাঁসকারীরা শুধু নিজেদের ব্যবসা করেছেন, আর দায়িত্বে থাকা মানুষগুলো নিশ্চয়ই তাঁদের দায়িত্ব পালন করছিলেন। তাহলে দোষটা কারও নয়, শুধু ক্ষতিটা হয়েছে হাজার হাজার মানুষের। আমাদের দেশে দায়িত্ব ভাগ করে দেওয়ার ব্যবস্থা এত সুন্দর যে দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হলে দায়টা ঠিক কার, সেটা আর খুঁজে পাওয়া যায় না।
তবে আমাকে বলুন, একটু দেখে লিখলে কীই বা হবে? আমার বান্ধবীরা যা বলত, দিনশেষে তো তাই, প্রশ্ন অনুযায়ী উত্তর দিতে পারলেই হলো। আমাদের মতো যারা গাধা, তারা তো দুই মার্ক কম পাবেই। আমরা পড়ব, মুখস্থ করব, পরীক্ষার হলে গিয়ে ভয় পাব, আর যারা আগে থেকেই প্রশ্ন জানবে তারা আমাদের চেয়ে ভালো করবে। তারপর পরীক্ষা বাতিল হলে আমরাই আবার প্রস্তুতি নেব, আবার টাকা খরচ করব, আবার সময় দেব। কর্তৃপক্ষ নতুন তারিখ ঘোষণা করবেন, নতুন পরীক্ষা হবে, আর আমরা আশা করব, এবারে অন্তত নিয়ম মেনে পরীক্ষা দিতে পারব। এই আশাটুকু ধরে রাখার জন্যও যে যথেষ্ট বোকা হতে হয়, সেটা বুঝতে আমার বেশ দেরি হয়েছে।
আমার বান্ধবীরা ঠিকই বলত, “একটু চালাক না হলে কি হয়?”
এখন শুধু ভাবি, আমরা যারা গাধা, তাদের পরীক্ষা বারবার নেওয়ার আগে একবার কর্তৃপক্ষেরও পরীক্ষা নেওয়া যায় না? প্রশ্নপত্র ফাঁস না করে, আগে থেকে উত্তর না জেনে, কোনো বিশেষ সুবিধা না নিয়ে, তাঁরা নিজেদের দায়িত্বটা ঠিকমতো পালন করতে পারেন কি না, সেটুকু যাচাই করা দরকার।
তবে সে পরীক্ষার প্রশ্নও যদি আগে থেকেই ফাঁস হয়ে যায়, তাহলে আরেকটা পরীক্ষা বাতিল করা ছাড়া আমাদের হাতে বোধহয় কিছুই থাকবে না।
Top stories