Medical_student_cropped

মানুষের জীবনের প্রথম কান্না আর শেষ নিঃশ্বাস—দুইটার সাথেই হাসপাতালের করিডর পরিচিত। অদ্ভুত এক জায়গা বটে। নিচতলায় যেমন নতুন সন্তানের খুশিতে বাবা-মায়ের চোখে আনন্দ ফুটে, তেমনি দোতলায় কারো বিদায়বেলায় দেয়ালগুলো কান্নার শব্দে ভারী হয়ে ওঠে। আর থাকে একটা আলাদা গন্ধ—ওষুধের, জীবাণুনাশকের আর কেমন একটা হতাশার গন্ধ। ঠিক যেন জীবন-মৃত্যুর মাঝখানে থেমে থাকা সময়।

ডা. মাহমুদ যেদিন প্রথম অফিসে যোগ দিতে এসেছিলেন, এই গন্ধটা খুব স্পষ্টভাবে টের পেয়েছিলেন। সবে শরতের শুরু। কাশবনে হয়তো ভালোবাসার মানুষের সাথে সাদা শাড়িতে কেউ কেউ বের হবে। আবার অনেকে হয়তো জানবেই না শরৎ এসে ছুঁয়ে চলে গেল। ডা. মাহমুদ কাশফুল ভালোবাসলেও কবি নন। তাই শরতের আনাগোনা নিয়ে তেমন একটা মাথাব্যথা নেই। কারণ বাস্তবতার চোখে তিনি পৃথিবী দেখেন। আর পাশাপাশি তিনি একজন আদর্শবাদী মানুষও বটে। মেডিকেলে পড়াকালীন সময়েই প্রতিজ্ঞা করেছিলেন, ডাক্তারি শুধু পেশা নয়—এইটা হবে তাঁর দায়িত্ব এবং ধর্ম। মানুষ যখন সবচেয়ে অসহায় অবস্থায় পড়ে তাঁর কাছে আসবে, তখন তার দিকে হাত বাড়িয়ে দেওয়া কোনো দয়া নয়, বরং একজন চিকিৎসকের কর্তব্য।

যাইহোক, প্রথম দিন হাসপাতালে ঢুকেই টের পেলেন জায়গাটা সহজ নয়। ভেতরে ঢুকতেই চোখে পড়ল কিছু লোক দাঁড়িয়ে আছে করিডোরের এক কোণায়। পরনে পাতলা শার্ট, হাতে কাগজের বান্ডিল, মুখে ধূর্ত হাসি। এরা রোগীর স্বজন নয়, রোগীও নয়—এরা দালাল। হাসপাতালের এক সিনিয়র নার্স প্রথম দিনেই চাপা স্বরে তাঁকে বুঝিয়ে দিলেন, “সাবধান থাকবেন স্যার। এরা সব জানে, সব পারে। কিন্তু কিছুই করে না বিনা লাভে।” মাহমুদ চুপচাপ শুনলেন। তিনি জানতেন, যাত্রাটা সহজ হবে না।

একটা হাসপাতালে মানুষ আসে ভাঙা শরীর নিয়ে, কিন্তু অনেকে ফিরে যায় ভাঙা মন নিয়ে। তবুও মানুষ আসে। কারণ মানুষের সেই পুরনো দুর্বলতা—‘আশা’। সেই ‘আশা’ নিয়েই দুপুরে হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এল রক্তিম। তার মায়ের অবস্থা সংকটজনক। তৎক্ষণাৎ রক্ত প্রয়োজন। দালালেরা সাথে সাথে ঘিরে ধরল রক্তিমকে। “ভাই, সরকারি রক্ত নিতে ঝামেলা আছে। আপনি টাকা দেন, আমরা রক্ত দিয়া দিমু। আর পেশেন্ট তো আপনার মা, দেরি করলে চলবে?” রক্তিম অসহায় চোখে চারপাশে তাকাল। ডা. মাহমুদ তখন পাশের কেবিন থেকে বের হচ্ছিলেন। সেই চোখজোড়া তাঁর চোখে ধরা পড়ল। একটা আতঙ্কিত ছেলে, যার প্রথম আশ্রয় ‘মা’ আজ নিজেই আশ্রয়ের খোঁজে। এই দিকে ছেলে ব্যর্থ, কিছু করতে পারছে না।

মাহমুদ দালালদের ঠেলে কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “তোমার মা কোথায়?” “আইসিইউতে স্যার… ব্লাড লাগবে। তারা বলল টাকা দিলে হবে…” “তোমার কাছে টাকা আছে?” রক্তিম মাথা নাড়ল। মাহমুদের বুক কেঁপে উঠল। তাঁর মনে হলো, রক্ত যদি পণ্যে পরিণত হয়, তাহলে বিবেক কোথায় হারায়?

তিনি নিজে গেলেন ব্লাড ব্যাংকে। স্টাফেরা অবাক—একজন ডাক্তার নিজে রক্ত খুঁজছেন? অনেক জিজ্ঞাসাবাদের পর মিলল রক্ত। কোনো টাকা ছাড়াই। এবং তা পৌঁছে গেল রক্তিমের মায়ের শরীরে। কিন্তু এই কাজটা চোখ রাঙাল দালালদের। তারা ক্ষুব্ধ হলো। কিন্তু একজন ডাক্তারের গায়ে হাত তো আর তোলা যায় না, তাই ভিন্ন পথ খুঁজে বের করল তারা। সবার কাছে মাহমুদের নামে গুজব ছড়াতে থাকল। তিনি রোগীদের বিনামূল্যে চিকিৎসার নামে ভুল চিকিৎসা দিচ্ছেন, নিজের নামে সুনাম কুড়াতে চাইছেন!

পরদিন হাসপাতালের নোটিস বোর্ডে গুজবগুলো একটা কাগজে লিখে প্রিন্ট করে টাঙিয়ে দেওয়া হলো। মাহমুদ বুঝলেন, এটা যুদ্ধ। আর এই যুদ্ধ শুধু হাসপাতালের না—সমাজের, নীতির, বিবেকের। তিনি লিখিত অভিযোগ করলেন পরিচালকের কাছে। কিন্তু পরিচালক কোনো ধরনের কথা শুনতে প্রস্তুত নন। এমনকি তাকেও বললেন যেন তিনি এই বিষয় থেকে দূরে থাকেন।

যে শরতের প্রতি ডা. মাহমুদের কোনো আগ্রহ ছিল না, নিজের কেবিনের জানালা খুলে সেই শরৎকেই গভীর আগ্রহে দেখতে শুরু করলেন। আকাশটা গাঢ় নীল। মনে মনে দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। কেন মানুষের মনের ভেতর এইরকম গাঢ় নীল হয়ে থাকে না? কেন মানুষের মধ্যে সাদা তুলোর মতো মেঘে ভেসে শুভ চিন্তা আসে না? শান্ত কোমল বাতাস কি এদের ছুঁয়ে যায় না? ভীষণ ভারী চিন্তা। অনেকক্ষণ ধরে তাকিয়ে থাকলেন প্রকৃতির ক্যানভাসের দিকে। হঠাৎই কেমন জানি একটা রাগ জমতে থাকল ভেতরে। জমতে জমতে তা ক্ষোভে রূপান্তরিত হলো।

তারপর গড়ে উঠল প্রতিরোধ। তিনি কেবিন থেকে বাইরে বেরিয়ে কমন রুমে আসলেন এবং সকল সহকর্মীকে ডেকে পাঠালেন। তারা একসাথে জড়ো হওয়ার পর তাদের দিকে তাকিয়ে পাহাড়সম দৃঢ়কণ্ঠে বললেন, “যদি আমরা নিজেদের দায়িত্ব ঠিকঠাক পালন করি, দালালদের অস্তিত্ব থাকবে না। আমাদের ভয় পাওয়ার কিছু নেই। রোগীর জীবন আমাদের হাতে। সেটা যেন বাজারের পণ্যে না পরিণত হয়। ভেবে দেখুন আজ যে ছেলে, যে মা নিজের মা কিংবা সন্তানের রক্তের জন্য হাসপাতালে ছোটাছুটি করছে, সেটা আপনার পরিবারের সদস্যও হতে পারত। তখনও কি চুপ থাকতেন সবাই?”

কেউ মাথা ঝাঁকাল, কেউ চোখ সরিয়ে নিল। তবুও মাহমুদ থামলেন না। বললেন, “তবে তাই হোক! এক বৃক্ষেই আন্দোলন শুরু হোক।”

এরপর তিনি বিভিন্ন জায়গায় যোগাযোগ করে রক্ত সরবরাহ ব্যবস্থা স্বচ্ছ করতে উদ্যোগ নিলেন। নামমাত্র যাচাই-বাছাইয়ের বদলে চালু করলেন ডিজিটাল রেজিস্ট্রেশন, রক্তদাতাদের স্বেচ্ছাসেবী তালিকা, স্বচ্ছ স্টোর রিপোর্টিং। কিন্তু শত্রুরাও এদিকে চুপ থাকার নয়। তাদের দীর্ঘদিনের গোছানো ব্যবসা ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে ডাক্তারের জন্য। তাই একদিন সন্ধ্যায় হাসপাতাল থেকে বের হওয়ার সময় দুইজন লোক তার পথরোধ করে বলল, “আপনি যা করছেন, তা ঠিক না। বেশি নীতির কথা ভাবলে নিজের নিরাপত্তা থাকে না।”

তাদের চোখে হুমকি, কণ্ঠে বিষ। মাহমুদ, যিনি আসলেই বৃক্ষে পরিণত হয়েছেন শক্ত শিকড়ে, শান্ত কণ্ঠে বললেন, “ভয় দেখিয়ে নীতিকে থামানো যায় না। সত্য দেরিতে আসে, তবে আসে একবারে বজ্র হয়ে।”

পরদিন হাসপাতালের ওয়ার্ডে গিয়ে তিনি সকল রোগীর আত্মীয়দের জোগাড় করলেন একসাথে। তারপর তাদের সামনে বললেন, “আপনারা জানেন, আপনারা কেন ভোগেন? কারণ, আপনাদের ভয় আছে। আর যারা ভয় দেখায়, তারা সেই ভয়েই টিকে থাকে। আজ থেকে যদি কেউ আপনাদের কাছ থেকে রক্ত বা সেবার নামে টাকা দাবি করে, আমাকে জানান। আমি আছি আপনাদের পাশে।” এক রোগীর মা উঠে দাঁড়ালেন, “স্যার, আপনি যেন ভালো থাকেন। আমরা আপনার মতো ডাক্তার চাই।”

এই কথা ছড়িয়ে পড়ল নানান দিকে। সোশ্যাল মিডিয়ার কল্যাণেও সেই দিন উপস্থিত কোনো রোগীর আত্মীয়র ফোনে ধারণ করা মাহমুদের সেই উক্তি ছড়িয়ে পড়ল দিগ্বিদিক। স্থানীয় একটি পত্রিকা “সাহসী ডাক্তার” নামে প্রতিবেদন ছাপাল। মানুষ জড়ো হতে শুরু করল। সামাজিক মাধ্যমে মাহমুদের সৎ অবস্থানের প্রশংসা হতে লাগল। একদল ছাত্র এসে জানাল, তারা স্বেচ্ছাসেবক হতে চায়। কিছু তরুণ চিকিৎসক তার দলে যোগ দিলেন। হাসপাতালের প্রশাসন ভীষণ চাপে পড়ল। অবশেষে, রক্তব্যবস্থার নতুন নীতি গ্রহণ করা হলো। দালালদের বিরুদ্ধে অভিযান চালানো হয়। কিছু চিহ্নিত দালাল বহিষ্কৃত হলো। ব্লাড ব্যাংকে বসানো হলো সিসি ক্যামেরা।

অবশেষে হেরে যাওয়া লড়াইটা যেন ডা. মাহমুদ জিতেই গেলেন। শরতের আর কিছুদিন বাকি আছে। কেবিনের জানালার কাছে বসে ডা. মাহমুদ তাকিয়ে আছেন খুব পরিচিত আকাশটার দিকে। বিশাল পরিবর্তন এসেছে তাঁর মধ্যে। হঠাৎ করে কলম আর কাগজের দিকে তাকিয়ে ভাবলেন একটা কবিতা লিখে ফেললে মন্দ হয় না। নিজের এই পরিবর্তন নিজের চোখে ধরা পড়ায় মুখে খুব সূক্ষ্ম একটা হাসি ফুটে উঠল। এমন সময় তাঁর কেবিনে কেউ নক করল। শান্ত কণ্ঠে তিনি ভেতরে আসতে বললেন।

তরুণ এক যুবক ভেতরে ঢুকল। হাতে খুব সুন্দর গোলাপ ফুলের তোড়া। ডাক্তার বিস্মিত কণ্ঠে বললেন, “কে তুমি?” “আমি রক্তিম। আপনার যুদ্ধে আমাকে সহযোদ্ধা হিসেবে নেবেন?” ডাক্তারের মুখে হাসি ফুটে উঠল। রক্তিম বলতেই থাকল, “কোনো একদিন বড় ভাইয়ের কল্যাণে রক্তদানের ভয় কাটিয়ে উঠে মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছিলাম। আর আমার বিপদে আপনি পাশে দাঁড়ালেন। আজকে বুঝলাম, জীবনের সত্য একটাই—মানুষের পাশে মানুষ থাকলে ঈশ্বরও পাশে থাকেন।”

ডা. মাহমুদ হাসিমুখে বললেন, “বুঝলে রক্তিম, শুধু কেউ একজন লাগে যে ‘না’ বলতে জানে। তারপর পরিবর্তনের স্রোত একা বইতে থাকে। আর তাতে থাকে তোমাদের মতো তরুণ সাহসী যোদ্ধা।” রক্তিম প্রশংসায় লজ্জাই পেল বটে। ডা. মাহমুদ হুট করে বলে উঠলেন, “রক্তিম, কাছে কোথাও কাশবন আছে?” রক্তিম আচমকা প্রশ্নে একটু অপ্রস্তুত হয়ে পড়ল। থমকে গিয়ে বলল, “জি স্যার আছে। কেন?” মুচকি হেসে হাতে কলম আর কাগজ তুলে নিয়ে ডা. মাহমুদ বললেন, “আমাকে নিয়ে যাবে? একটা কবিতা লিখতাম।” বাইরে গাঢ় নীল আকাশটাও বুঝি মুচকি হেসে উঠল।