ঢাবির নিয়মিত মাস্টার্সে বাইরের শিক্ষার্থীদের সুযোগ: নীতিমালার তিন বছরেও অধিকাংশ বিভাগে বাস্তবায়ন হয়নি
কেন্দ্রীয় ভর্তি অফিসের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক পর্যায়ের ৭৩টি বিভাগ ও আটটি ইনস্টিটিউটের মধ্যে মাত্র ২১টি বিভাগ নিয়মিত মাস্টার্স প্রোগ্রামের খালি আসনে বাইরের শিক্ষার্থীদের ভর্তির সুযোগ চালু করেছে।
ঢাবির নিয়মিত মাস্টার্সে বাইরের শিক্ষার্থীদের সুযোগ: নীতিমালার তিন বছরেও অধিকাংশ বিভাগে বাস্তবায়ন হয়নি
কেন্দ্রীয় ভর্তি অফিসের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক পর্যায়ের ৭৩টি বিভাগ ও আটটি ইনস্টিটিউটের মধ্যে মাত্র ২১টি বিভাগ নিয়মিত মাস্টার্স প্রোগ্রামের খালি আসনে বাইরের শিক্ষার্থীদের ভর্তির সুযোগ চালু করেছে।
অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতকদের নিয়মিত মাস্টার্স প্রোগ্রামে ভর্তির সুযোগ দিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় যে নীতি চালু করেছিল, তিন বছর পরও অধিকাংশ বিভাগই তা বাস্তবায়ন করতে পারেনি। অনেক বিভাগে আসন খালি থাকলেও এ নীতির আওতায় বাইরের শিক্ষার্থীদের ভর্তির সুযোগ দেওয়া হচ্ছে না।
কেন্দ্রীয় ভর্তি অফিসের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক পর্যায়ের ৭৩টি বিভাগ ও আটটি ইনস্টিটিউটের মধ্যে মাত্র ২১টি বিভাগ নিয়মিত মাস্টার্স প্রোগ্রামের খালি আসনে বাইরের শিক্ষার্থীদের ভর্তির সুযোগ চালু করেছে।
যে ৬০টি বিভাগে এ প্রক্রিয়া চালু হয়নি, সেগুলোতে প্রায় ৫০০ আসন খালি রয়েছে। আগের দুই শিক্ষাবর্ষেও একই ধরনের প্রবণতা দেখা গেছে।
২০২২ সালে সিন্ডিকেটের মাধ্যমে পুনরায় চালু করা এ নীতি অনুযায়ী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব স্নাতক শিক্ষার্থীদের মাস্টার্সে ভর্তির পর যেসব আসন খালি থাকে, সেগুলোতে অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ভর্তির জন্য প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে পারেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি অফিসের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ইনস্টিটিউটগুলোর মধ্যে শুধু ব্যবসায় প্রশাসন ইনস্টিটিউটে (আইবিএ) এ কার্যক্রম চালু রয়েছে। তবে নীতিমালা চালুর আগে থেকেই ইনস্টিটিউটটি স্বতন্ত্রভাবে শিক্ষার্থী ভর্তি করে আসছে।
অন্যদিকে, কলা অনুষদের ১৭টি বিভাগের মধ্যে সর্বোচ্চ ৯টি বিভাগ শূন্য আসনে বাইরের শিক্ষার্থী ভর্তি করছে। বিজ্ঞানের পাঁচটি অনুষদের ২৪টি বিভাগের মধ্যে এ কার্যক্রম চালু রয়েছে আটটি বিভাগে।
তবে ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদের কোনো বিভাগই এ কার্যক্রম চালু করেনি।
কারিকুলাম ও প্রক্রিয়াগত জটিলতার কথা বলছে বিভাগগুলো
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের তিনটি অনুষদের অন্তত আটটি বিভাগের চেয়ারম্যানের সঙ্গে কথা বলেছে দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড।
তাদের মতে, নিয়মিত মাস্টার্স প্রোগ্রামের পাঠ্যক্রম একই বিভাগে চার বছর ধরে পড়াশোনা করা শিক্ষার্থীদের কথা মাথায় রেখে তৈরি। অন্য বিভাগ বা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আসা শিক্ষার্থীদের সেই নির্দিষ্ট ভিত্তি বা কোর্সগুলোর সঙ্গে পূর্বপরিচয় থাকে না। ফলে তাদের ক্ষেত্রে কিছু জটিলতা তৈরি হতে পারে। এ ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ভেদে পাঠ্যক্রমের ভিন্নতার কথাও বলেছেন কেউ কেউ।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ফাইন্যান্স বিভাগের নিয়মিত মাস্টার্স প্রোগ্রামের ভর্তি তালিকা বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, গত তিন বছরে গড়ে প্রায় ৩০টি করে আসন খালি ছিল।
বিভাগটির চেয়ারম্যান অধ্যাপক এইচ এম মোশারফ হোসেন দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, “অন্য কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে বিবিএতে যা পড়ানো হয়, আমাদের এখানকার এমবিএ সিলেবাসের সঙ্গে তার কোনো মিল থাকে না। এই অবস্থায় তার ডিগ্রি কীভাবে ‘ইকুইভ্যালেন্ট’ বা সমমান করা হবে, তা নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন আগে থেকে চিন্তা করেনি। এই কারিকুলামগত জটিলতার কারণে আমরা ভর্তিতে যেতে পারিনি।”
কারিকুলামের পাশাপাশি ভর্তি কার্যক্রমের সময় নিয়েও জটিলতার কথা জানিয়েছে কিছু বিভাগ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক বিভাগে অনার্স পরীক্ষা শেষ হওয়ার কিছুদিনের মধ্যেই নিয়মিত মাস্টার্সের ক্লাস শুরু হয়। কিন্তু চূড়ান্ত ফল প্রকাশ হতে অন্তত দুই থেকে আড়াই মাস সময় লাগে। ফল প্রকাশের আগে কতটি আসন খালি থাকবে, তা বিভাগগুলোর পক্ষে জানা সম্ভব হয় না। এ অবস্থায় দুই মাস পর নতুন শিক্ষার্থীদের ক্লাস শুরু করলে একাডেমিক কার্যক্রমে জটিলতা তৈরি হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
তবে যেসব বিভাগ বাইরের শিক্ষার্থীদের ভর্তি করছে, তাদের মতে, বিদ্যমান কারিকুলাম ও নীতিমালা মেনেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘নিজস্ব মান’ বজায় রেখে শিক্ষার্থী ভর্তি করা সম্ভব হচ্ছে। নিয়মিত মাস্টার্সে এ ভর্তি কার্যক্রম চালু করা পাঁচটি বিভাগের চেয়ারম্যান ও শিক্ষকের সঙ্গে কথা বলেছেন এ প্রতিবেদক।
সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ১৬টি বিভাগের মধ্যে শুধু ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ বিভাগে নিয়মিত মাস্টার্সে বাইরের শিক্ষার্থীদের ভর্তি করা হচ্ছে। গত তিন শিক্ষাবর্ষে এ বিভাগের নিয়মিত মাস্টার্স প্রোগ্রামে পরীক্ষার মাধ্যমে মোট ২৮ জন শিক্ষার্থী ভর্তি হয়েছেন।
বিভাগটির চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. নাঈম সুলতানা দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, “ঢাকার বাইরের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষার্থীদের একধরনের অসন্তুষ্টি আছে যে, সেখানে সিনিয়র শিক্ষকরা তেমন যান না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তারা সেই সুযোগটা পাচ্ছে। আমরাও ভালো শিক্ষার্থী পাচ্ছি।”
তিনি জানান, এ ভর্তি প্রক্রিয়া পরিচালনায় তাদের কোনো জটিলতায় পড়তে হয়নি। বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়মিত মাস্টার্সের প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী পরীক্ষা কমিটি গঠন, প্রশ্নপত্র প্রণয়ন ও খাতা মূল্যায়নসহ পুরো প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হচ্ছে।
সমুদ্রবিজ্ঞান বিভাগের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ড. আবু হেনা মুহাম্মদ ইউসুফ দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, ভর্তি পরীক্ষার লিখিত ও মৌখিক অংশ এমনভাবে নেওয়া হয়, যাতে যোগ্য শিক্ষার্থীরাই নির্বাচিত হন। ফলে কারিকুলামে কোনো পরিবর্তন আনতে হয়নি।
নিয়মিত মাস্টার্সে বাইরের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ভর্তির সুযোগ চালুর পরও অধিকাংশ বিভাগে তা বাস্তবায়িত না হওয়াকে প্রশাসনিক নিষ্ক্রিয়তার ফল হিসেবে দেখছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মোহাম্মদ মজিবুর রহমান।
তার মতে, এ সংকট সমাধানে মাস্টার্সের ভর্তি প্রক্রিয়ায় সংস্কার এনে আলাদা ভর্তি পরীক্ষা নেওয়া যেতে পারে। অথবা অনার্সের ফলের ভিত্তিতে নির্দিষ্টসংখ্যক নিজস্ব শিক্ষার্থী ভর্তি করে বাকি আসনে উন্মুক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে বাইরের মেধাবী শিক্ষার্থীদের সুযোগ দেওয়া যেতে পারে।
তিনি বলেন, “এতে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা ও গবেষণার প্রতি মনোযোগ ও প্রতিযোগিতা বাড়বে।”
২০২২ সালের এই সিদ্ধান্তের আগে কেবল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক সম্পন্ন করা শিক্ষার্থীরাই নিজ বিভাগে নিয়মিত স্নাতকোত্তর করার সুযোগ পেতেন। আবার বিশ্ববিদ্যালয়ের এক বিভাগ বা ইনস্টিটিউট থেকে স্নাতক সম্পন্ন করা শিক্ষার্থীরা অন্য বিভাগ বা ইনস্টিটিউটে স্নাতকোত্তর করতে চাইলে প্রফেশনাল মাস্টার্স তথা ব্যয়বহুল সান্ধ্য কোর্স ছিল একমাত্র উপায়।
এই নীতিমালা অনুযায়ী, স্নাতকোত্তরের ফি বাইরের শিক্ষার্থী এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক সম্পন্ন করা শিক্ষার্থীদের জন্য সমান। ফলে দেশের উচ্চশিক্ষার সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়মিত মাস্টার্স প্রোগ্রামে অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের আগ্রহ রয়েছে।
সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি বিভাগে প্রফেশনাল মাস্টার্সে ভর্তি হয়েছেন রাজধানীর একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ফারিয়া লিরা।
দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে তিনি বলেন, “সদ্য গ্র্যাজুয়েট হয়েও আমাকে একটা প্রফেশনাল মাস্টার্সে পড়তে হচ্ছে। এটা বেশ ব্যয়বহুল; আমার প্রায় ১ লাখ ৬০ হাজার টাকার মতো খরচ হচ্ছে। নিয়মিত মাস্টার্সে ভর্তির সুযোগ থাকলে আমি নিশ্চিতভাবেই চেষ্টা করতাম।”
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) অধ্যাপক ড. আবদুস সালাম দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, “মাস্টার্সের ভর্তি প্রক্রিয়া বিভাগগুলোর একাডেমিক কমিটির মাধ্যমেই হয়। তাই তথ্য যাচাই করে কেন এটি চালু করা হচ্ছে না, তা ডিন অফিস বা বিভাগগুলোর কাছে জানতে চাইব। সে অনুযায়ী আমরা ব্যবস্থা নেব।”