দৈনন্দিন খরচের বরাদ্দ কমানোয় নিজ পকেটের টাকা খরচ করতে হচ্ছে প্রাথমিকের শিক্ষকদের
শিক্ষকরা জানান, দুই বছর আগেও অনেক বিদ্যালয় বছরে ৬০ হাজার থেকে ১ লাখ ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত স্লিপের অর্থ পেত। এখন তা নেমে এসেছে ১০-১২ হাজারে।
দৈনন্দিন খরচের বরাদ্দ কমানোয় নিজ পকেটের টাকা খরচ করতে হচ্ছে প্রাথমিকের শিক্ষকদের
শিক্ষকরা জানান, দুই বছর আগেও অনেক বিদ্যালয় বছরে ৬০ হাজার থেকে ১ লাখ ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত স্লিপের অর্থ পেত। এখন তা নেমে এসেছে ১০-১২ হাজারে।
বিদ্যালয়ের উন্নয়ন ও প্রয়োজনীয় খরচের জন্য দেওয়া স্কুল লেভেল ইমপ্রুভমেন্ট প্ল্যান (স্লিপ) তহবিলের বরাদ্দ ব্যাপকভাবে কমে যাওয়ায় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের এখন স্কুলের দৈনন্দিন খরচ মেটাতে নিজেদের পকেট থেকে টাকা দিতে হচ্ছে।
শিক্ষকরা বলছেন, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে পরীক্ষার ফি নেওয়ার নিয়ম না থাকায় শিক্ষা উপকরণ কেনা থেকে শুরু করে ছোটখাটো মেরামতের খরচ মেটানোও কঠিন হয়ে পড়েছে। এই অর্থায়ন সংকটের কারণে অনেক ক্ষেত্রে বিদ্যালয়ের প্রয়োজন মেটাতে শিক্ষকদের নিজেদের বেতনের টাকা ব্যবহার করতে হচ্ছে।
১ লাখ টাকা থেকে কমে মাত্র ১০ হাজারে
প্রাথমিক স্তরে অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক শিক্ষাকে উৎসাহিত করতে ২০১০ সালের পর আনুষ্ঠানিক ফি নেওয়া বন্ধ করে আওয়ামীলীগ সরকার। পরে পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ছাপানোসহ বিদ্যালয়ের বিভিন্ন প্রয়োজনীয় খরচ মেটাতে স্লিপ ফান্ড বা বার্ষিক অনুদান দেওয়া শুরু হয়। কিন্তু এই বরাদ্দ আগের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।

প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের ২৩ ফেব্রুয়ারির নির্দেশনা অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে স্লিপের জন্য চাহিদার তুলনায় কম অর্থ পেয়েছে স্কুলগুলো।
৫০ জন পর্যন্ত শিক্ষার্থী থাকা বিদ্যালয় পাবে ৭ হাজার ৫০০ টাকা। ৫১ থেকে ৩০০ শিক্ষার্থীর বিদ্যালয় পাবে ১৫ হাজার টাকা। ৩০১ থেকে ৬০০ শিক্ষার্থীর জন্য ২২ হাজার ৫০০ টাকা, ৬০১ থেকে ১ হাজার শিক্ষার্থীর জন্য ৩০ হাজার টাকা ও ১ হাজারের বেশি শিক্ষার্থী থাকলে ৩৭ হাজার ৫০০ টাকা বরাদ্দ রয়েছে।
শিক্ষকরা জানান, দুই বছর আগেও অনেক বিদ্যালয় বছরে ৬০ হাজার থেকে ১ লাখ ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত স্লিপের অর্থ পেত। সেই অর্থ দিয়ে বিদ্যালয়ের উন্নয়ন, স্টেশনারি, পরীক্ষা ও মেরামতের খরচ মেটানো হতো।
কুমিল্লার নাঙ্গলকোটের জোড্ডা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নিজাম উদ্দিন মজুমদার বলেন, আগে স্লিপে এক লাখ টাকা বরাদ্দ পাওয়া গেলেও এবার পেয়েছেন সাড়ে ১২ হাজার টাকা। ভ্যাট কাটার পর হাতে থাকে প্রায় ১০ হাজার টাকা। ‘এই অর্থ দিয়ে বিদ্যালয়ের উন্নয়ন করা সম্ভব নয়,’ বলেন তিনি।
লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলার আন্ধারমানিক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. জামাল উদ্দিন শিহাব বলেন, গত বছর তারা ১৫ হাজার টাকা বরাদ্দ পেলেও বিভিন্ন কর্তনের পর তা দাঁড়ায় প্রায় ১২ হাজার টাকায়। এই অর্থ দিয়ে সারা বছরের পরীক্ষার কাগজ, প্রশ্নপত্র, খাতা-কলম ও ডাস্টার কেনা সম্ভব নয়।
প্রতি পরীক্ষায় প্রশ্নপত্রের জন্য উপজেলা শিক্ষা অফিসে দেড় থেকে ২ হাজার টাকা দিতে হয়। ফলে বিদ্যালয়ের খরচ মেটাতে তাকে নিজের বেতন থেকেও টাকা দিতে হচ্ছে।
একই উপজেলার চর উভূতি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. শাহ আলম বলেন, প্রতিটি সাময়িক পরীক্ষায় প্রশ্নপত্রসহ বিভিন্ন খাতে দুই থেকে তিন হাজার টাকা খরচ হয়। কম বরাদ্দের কারণে বিদ্যালয়ের অন্যান্য প্রয়োজনীয় খরচ মেটানোও কঠিন হয়ে পড়েছে।
পাবনার চাটমোহরের দাঁথিয়া কয়রাপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক আব্দুল আজিজ বলেন, বর্তমান বরাদ্দে তিনটি পরীক্ষার খরচ মেটানোই কঠিন। অনেক সময় শিক্ষকেরা নিজেদের টাকা দিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেন।
নওগাঁ সদর উপজেলার ভীমপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক ফিরোজ করীর বলেন, আগে স্লিপের অর্থ দিয়ে ফ্যানসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম মেরামত করা যেত। এখন বাল্ব নষ্ট হলেও অনেক সময় তা ঠিক করার টাকা থাকে না।
পরীক্ষার ফি নেই, পরীক্ষার জন্য টাকাও নেই
প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় এ বছরের জুনের শুরুতে পর্যাপ্ত স্লিপ ফান্ড না থাকার কারণ দেখিয়ে শ্রেণিভেদে ২০ থেকে ৫০ টাকা পরীক্ষার ফি নির্ধারণ করেছিল।
তবে এ সিদ্ধান্ত নিয়ে সমালোচনা হলে ১৬ জুন তা বাতিল করা হয়। ফলে বর্তমানে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে পরীক্ষার কোনো ফি নেওয়া যাচ্ছে না।
প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের একজন কর্মকর্তা বলেন, চতুর্থ প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন কর্মসূচির (পিইডিপি৪) মেয়াদ শেষ হওয়ায় বর্তমানে স্লিপের অর্থ ছাড় বন্ধ রয়েছে। বিদ্যালয়গুলোকে এ সময়ের খরচের হিসাব ও ভাউচার সংরক্ষণ করতে বলা হয়েছে।
ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, নতুন পিইডিপি৫ কর্মসূচি চালু হলে স্লিপ ফান্ডের ব্যবস্থাপনা সহজ করার পরিকল্পনা রয়েছে।
গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে চৌধুরী বলেন, স্লিপের টাকা কোথায় খরচ হচ্ছে, তা নজরদারির মধ্যে রাখতে হবে। অনিয়ম থাকলে তদন্ত করতে হবে। তবে এর কারণে সৎ শিক্ষকদের সমস্যায় ফেলা উচিত নয়।
শিক্ষাবিদ অধ্যাপক মনজুর আহমেদ বলেন, বিদ্যালয় পর্যায়ে বিকেন্দ্রীকৃত দায়িত্ব ও আর্থিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করার পাশাপাশি যথাযথ তদারকি প্রয়োজন। ‘দুর্নীতি ও অনিয়মের দায়ে ভালো শিক্ষকদের ভোগা উচিত নয়। যথাযথ জবাবদিহির মাধ্যমে বিকেন্দ্রীকৃত ব্যবস্থাপনা কার্যকর করতে হবে,’ বলেন তিনি।