জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে র্যাগিংয়ের অভিযোগে ২০ শিক্ষার্থীকে ৬ লাখ ১৫ হাজার টাকা জরিমানা
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে র্যাগিংয়ের অভিযোগে ২০ শিক্ষার্থীকে ৬ লাখ ১৫ হাজার টাকা জরিমানা
বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য শৃঙ্খলা সংক্রান্ত অধ্যাদেশ ২০১৮-এর ধারা ৩(২)(ঘ) অনুযায়ী এ দণ্ড প্রদান করা হয়।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে (জাবি) নবীন শিক্ষার্থীদের র্যাগিং ও মানসিক-শারীরিক নির্যাতনের অভিযোগে ইতিহাস ও পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের ২০ শিক্ষার্থীকে বিভিন্ন অঙ্কের আর্থিক জরিমানা করা হয়েছে। জরিমানা পরিশোধ না করা পর্যন্ত তাদের যেকোনো পরীক্ষায় অংশগ্রহণের সুযোগ স্থগিত থাকবে বলে ঘোষণা করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।
বুধবার (১৬ সেপ্টেম্বর) বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার ড. এ বি এম আজিজুর রহমান স্বাক্ষরিত পৃথক দুটি অফিস আদেশে এ সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়।
এর আগে গত ১৩ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেটের এক বিশেষ সভায় ডিসিপ্লিন বোর্ডের সুপারিশ ও তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের ভিত্তিতে এ শাস্তিমূলক ব্যবস্থা অনুমোদিত হয়।
অফিস আদেশ সূত্রে জানা যায়, গত ৩ জুলাই দিবাগত রাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অ্যান্ড কলেজ মাঠে ইতিহাস বিভাগের ৫৪তম ব্যাচের (শিক্ষাবর্ষ ২০২৪-২৫) কতিপয় শিক্ষার্থী কর্তৃক একই বিভাগের ৫৫তম ব্যাচের (শিক্ষাবর্ষ ২০২৫-২৬) ১৩ জন শিক্ষার্থীকে বিভিন্নভাবে অকথ্য ভাষায় গালাগাল, কান ধরানো ও ম্যানার শেখানোর নামে র্যাগিং করার ঘটনা ঘটে। র্যাগিং প্রতিরোধ কমিটির তদন্তে দোষী সাব্যস্ত হওয়ায় ইতিহাস বিভাগের ১২ জন শিক্ষার্থীকে শাস্তি দেওয়া হয়। তাদের মধ্যে একজনকে ৩০ হাজার টাকা এবং বাকি ১১ জনকে ২০ হাজার টাকা করে মোট ২ লাখ ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়।
অন্যদিকে, পৃথক আরেকটি আদেশে পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের আট শিক্ষার্থীকে আর্থিক জরিমানা করা হয়েছে। গত ২০ জুলাই দিবাগত রাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের শের-ই-বাংলা এ কে ফজলুল হক হলের পশ্চিম পাশে (মনপুরা) একই বিভাগের কনিষ্ঠ (৫৫তম ব্যাচ) শিক্ষার্থীদের কান ধরে ওঠবস করানো, অকথ্য ভাষায় গালাগাল ও অমানবিক নির্যাতন করার সত্যতা মেলে তদন্তে।
এর প্রেক্ষিতে পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের চারজন শিক্ষার্থীকে ৫০ হাজার টাকা করে, দুইজনকে ৪৫ হাজার টাকা করে, একজনকে ৪০ হাজার টাকা এবং একজনকে ৩৫ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। এই বিভাগ থেকে মোট জরিমানার পরিমাণ ৩ লাখ ৬০ হাজার টাকা।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য শৃঙ্খলা সংক্রান্ত অধ্যাদেশ ২০১৮-এর ধারা ৩(২)(ঘ) অনুযায়ী এ দণ্ড প্রদান করা হয়।
আদেশে উল্লেখ করা হয়, জরিমানা পরিশোধ না করা পর্যন্ত অভিযুক্তদের চলমান পরীক্ষা, টার্ম ফাইনাল অথবা পরবর্তী নির্ধারিত পরীক্ষায় অংশগ্রহণের অনুমতি স্থগিত থাকবে।
এছাড়া এ ধরনের অপরাধ পুনরায় সংঘটিত হলে তা শৃঙ্খলাভঙ্গ হিসেবে গণ্য করে ভবিষ্যতে আরও কঠোর শাস্তি দেওয়া হবে বলেও সতর্ক করা হয়েছে।
সার্বিক বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার ড. এ বি এম আজিজুর রহমান বলেন, ‘র্যাগিংয়ের অভিযোগ ওঠার পর প্রথমে শৃঙ্খলা বোর্ড বিষয়টি তদন্ত করে শাস্তির সুপারিশ করে। পরে সিন্ডিকেটের মাধ্যমে ওই সুপারিশ চূড়ান্তভাবে অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। তবে শাস্তিপ্রাপ্ত শিক্ষার্থীরা চাইলে এই আদেশের বিরুদ্ধে আপিল করার সুযোগ পাবেন।’
অন্যদিকে, বিশ্ববিদ্যালয় সহকারী প্রক্টর ড. আবদুছ ছাত্তার জয় বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের শৃঙ্খলাবিধিতে সর্বনিম্ন ৫ হাজার থেকে যেকোনো অঙ্কের জরিমানার সুযোগ রয়েছে। অপরাধের মাত্রা বিবেচনা করে তদন্ত কমিটি সরাসরি আর্থিক জরিমানার সুপারিশ করে, যা সিন্ডিকেট বহাল রাখে। মূলত অভিভাবকদের সম্পৃক্ত করতেই এই শাস্তি—যাতে সন্তান কী করেছে তা পরিবার জানতে পারে। পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের র্যাগিংয়ের ধরন ছিল অত্যন্ত মারাত্মক। অভিযুক্তরা প্রশাসনকে তোয়াক্কা না করে ভীতিকর পরিবেশ তৈরি করেছিল। তাই তাদের জরিমানার অঙ্ক সর্বোচ্চ ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়। পরে সিনিয়র-জুনিয়রদের মধ্যে ক্ষতিপূরণ দিয়ে আপসের চেষ্টা করা হয় এবং ভুক্তভোগীদের দিয়ে অভিযোগ প্রত্যাহারের আরজি জানানো হয়। তবে তদন্ত কমিটি ও সিন্ডিকেট তা সরাসরি নাকচ করে দেয়। শিক্ষকদের দীর্ঘ তদন্ত ও আনুষ্ঠানিক প্রতিবেদন তৈরির পর ‘সমঝোতা হয়েছে’ বলে অভিযোগ প্রত্যাহার গ্রহণযোগ্য নয় বলে জানায় প্রশাসন। এখানে ভুক্তভোগীদের ওপর কোনো প্রকার মানসিক চাপ বা ভীতি কাজ করছে কি না, তা নিয়েও সন্দেহ তৈরি হয়।’