সমাজের উপহাস উপেক্ষা করে পশুপালন খাতে সফল হয়েছেন অঞ্জনা রানী
সমাজের নানা উপহাস ও হয়রানি উপেক্ষা করে অঞ্জনা রানী তার গ্রামে গরুর কৃত্রিম প্রজনন সরবরাহকারী হয়ে ওঠেন। এর মধ্য দিয়ে দীর্ঘদিন ধরে পুরুষ নিয়ন্ত্রিত খাতটিতে নিজের কতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেন। অধ্যবসায় এবং প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তিনি একটি সফল ক্যারিয়ার গড়ে তোলেন, নিজের পরিবারকে সহায়তা করেন এবং অন্য নারীদের এই পেশায় আসতে অনুপ্রাণিত করেন।
সমাজের উপহাস উপেক্ষা করে পশুপালন খাতে সফল হয়েছেন অঞ্জনা রানী
সমাজের নানা উপহাস ও হয়রানি উপেক্ষা করে অঞ্জনা রানী তার গ্রামে গরুর কৃত্রিম প্রজনন সরবরাহকারী হয়ে ওঠেন। এর মধ্য দিয়ে দীর্ঘদিন ধরে পুরুষ নিয়ন্ত্রিত খাতটিতে নিজের কতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেন। অধ্যবসায় এবং প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তিনি একটি সফল ক্যারিয়ার গড়ে তোলেন, নিজের পরিবারকে সহায়তা করেন এবং অন্য নারীদের এই পেশায় আসতে অনুপ্রাণিত করেন।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের একসময়ের জনপ্রিয় মিম ‘পুরুষদের কাজে নারী’, যেখানে ঐতিহ্যগতভাবে পুরুষদের কাজের ক্ষেত্রে নারীদের প্রবেশের বিষয়টি ব্যঙ্গাত্মকভাবে তুলে ধরা হয়। কিন্তু সেই গতানুগতিক ধারণাটি ছিল অঞ্জনা রানির জন্য বাস্তবতা, যিনি তাঁর গ্রামে গরুর জন্য কৃত্রিম প্রজননসংশ্লিষ্ট সেবা দেওয়া শুরু করেন।
অঞ্জনা এই সেবার ঘোষণা দিয়ে পোস্টার লাগিয়েছিলেন, কিন্তু কুড়িগ্রামে তাঁর গ্রামের পুরুষরা এতে খুশি ছিলেন না। তাঁরা বলেছিল, ‘এটা কোনো নারীর কাজ নয়। পোস্টারগুলো নামিয়ে দাও।’ কিন্তু অঞ্জনা তা করেননি।
বছর ঘুরতেই তিনি হাজারো গরুকে গর্ভধারণ করাতে শুরু করেন। এর মধ্য দিয়ে দীর্ঘদিন ধরে ‘পুরুষদের জন্য’ প্রতিষ্ঠিত একটি খাতে অঞ্জনা সম্মান অর্জন করেন। তিনি বলেন, ‘ছোটবেলা থেকেই আমি ভিত্তিহীন সমালোচনা উপেক্ষা করতে জানতাম।’ কৃষক পরিবারে জন্ম নেওয়া অঞ্জনা চার ভাইবোনের মধ্যে সবার ছোট ছিলেন। তাঁর বাবা ছিলেন একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। অঞ্জনাদের জীবন খুব একটা সহজ ছিল না।
অঞ্জনা বলেন, আমরা কখনোই আর্থিকভাবে স্থিতিশীল ছিলাম না। বাবা-মা আমাদের নিয়মিত স্কুলে যাওয়া নিশ্চিত করেছিলেন। কিন্তু যখন আমরা বাড়ি ফিরতাম, তখন নানা ধরনের কাজ করা লাগত।
পশুপাখির প্রতি অঞ্জনার আকর্ষণ ছোটবেলা থেকেই শুরু হয়েছিল। যখন সে নিঃসঙ্গ বোধ করত তখন সে ছাগল ও গরু পালন করত। সে বলে, ‘মানুষ সবসময় আমাকে মেয়ে হিসেবে নিজের সীমার মধ্যে থাকার কথা মনে করিয়ে দিত। প্রাণীরা কখনও তা করেনি। তারা আমার বন্ধু ছিল।’
কলেজে পড়ার সময় অঞ্জনা তাঁর মাকে ক্যানসারে হারান, এই ঘটনায় তাঁর জীবন বদলে যায়। তাঁর পরিবারকে আরও বেশি কাজ করতে হতো, স্বপ্নগুলোও থমকে যায়। সে একবার পুলিশে যোগদানের কথা ভেবেছিল, কিন্তু তাঁর ভাই তাঁকে বাধা দেয়। পরে কলেজের প্রথম বর্ষে পড়ার সময় অঞ্জনাকে বিয়ে দেওয়া হয়।
বিয়ের উপহার হিসেবে অঞ্জনার বাবা তাঁকে একটি গরু দিয়েছিলেন। তিনি স্মৃতিচারণ করে বলেন, ‘আমরা একটি ছোট টিনশেড ঘরে উঠেছিলাম। আমি আমার স্বামীকে বলেছিলাম আমি নিজের পায়ে দাঁড়াতে চাই।’ এই দম্পতি গরু, ছাগল এবং মুরগি পালন শুরু করেন, কিন্তু যখন তাদের পশু অসুস্থ হয়ে পড়ে, তখন চিকিৎসার খরচ বোঝা হয়ে দাঁড়ায়।
এরপর অঞ্জনাদের জীবনে নতুন সন্ধিক্ষণ আসে। একজন নারী নেতা তাঁদের পশুপালন প্রশিক্ষণ নেওয়ার পরামর্শ দেন। অঞ্জনা বলেন, কোনো নারী আগ্রহী ছিলেন না। কিন্তু আমি স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ করেছি।
অঞ্জনার প্রথম প্রশিক্ষণ হয়েছিল কুড়িগ্রামের প্রত্যন্ত এলাকায়, তারপর আরেকটি প্রশিক্ষণ হয়েছিল ময়মনসিংহের গ্রামাঞ্চলে। তিনি বলেন, ‘আমাদের অনেকেই প্রথমবারের মতো একা বাড়ি থেকে বের হয়েছিলাম। প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে পুরুষদের প্রাধান্য ছিল, যারা প্রায়শই বিষয়গুলো কঠিন করে তুলত। তারা প্রশিক্ষকদের মুঠোফোন নম্বর পেতেন এবং সামনের সারিতে বসার জন্য আগেই পৌঁছে যেতেন। আমরা সবার জন্য রান্না করব, এমনটাও অনেকে ভেবেছিল।’
অঞ্জনাসহ সনাতন ধর্মাবলম্বী নারী অংশগ্রহণকারীরা ধর্মীয় কারণে গরুর মাংস রান্না করতে অস্বীকৃতি জানান, তখন কিছু পুরুষ আপত্তি তোলেন। কর্মকর্তারা হস্তক্ষেপ করেন, প্রত্যেককে নিজের খাবারের ব্যবস্থা করতে বলেন এবং সামনের সারির আসনগুলো নারীদের জন্য সংরক্ষণ করেন।
হয়রানি সেখানেই থামেনি। অঞ্জনা বলেন, ‘পুরুষরা কোনোভাবে আমাদের ফোন নম্বর খুঁজে পেয়েছিল এবং অশ্লীল বার্তা পাঠাতে শুরু করে। আমরা অভিযোগ করার পর এটি বন্ধ হয়। তবে এই অভিজ্ঞতা আমাকে অস্বস্তিতে ফেলে।’
এসব প্রতিকূলতা সত্ত্বেও, অঞ্জনা অবশেষে চলাচল ও শেখার ক্ষেত্রে স্বাধীনতা খুঁজে পান। তাঁর গ্রামের একজন স্থানীয় পশুচিকিৎসক একবার অঞ্জনার গরুকে গর্ভধারণ করিয়েছিল। অঞ্জনা এই দক্ষতা শেখার গুরুত্ব বুঝতে পারেন। নিজের নাম নথিভুক্ত না হওয়া পর্যন্ত অঞ্জনা প্রতি সপ্তাহে কর্মকর্তাদের ফোন করতেন। তিনি বলেন, এটি ছিল ৪৫ দিনের প্রশিক্ষণ। শেষে একটি সার্টিফিকেট দেওয়া হয়।
যারা স্নাতক পাস তাঁদের বলা হয়েছিল তাঁরা আরও একটি কোর্স সম্পন্ন করলে ব্র্যাকের জন্য কাজ করতে পারবে। কোর্স করতে খরচ হবে ৬০ হাজার টাকা। নারীদের জন্য ফি কমিয়ে ৩০ হাজার টাকা করা হয়, যা কিস্তিতে পরিশোধ করা যাবে। অঞ্জনা বলেন, তখনও অনেকেই দ্বিধাগ্রস্ত ছিল। লোকজন নানা কথা বলছিল। নারীদের বাড়ির বাইরে যাতায়াতকে খারাপ চোখে দেখা হতো।
কোর্সটি শেষ হওয়ার পর, নারীদের তাদের নতুন সেবার বিষয়ে প্রচার করতে বলা হয়েছিল। কিন্তু অঞ্জনা পোস্টার লাগানোর সঙ্গে সঙ্গেই পুরুষদের কাছ থেকে তাকে ফোন করা শুরু হয়। এমন সব গরু দেখতে যাওয়ার জন্য বলা হতো যেগুলোর কোনো অস্তিত্ব ছিল না। অঞ্জনাকে বেনামী নম্বর থেকে হুমকি দেওয়া হতো। অবশেষে তিনি পুলিশের কাছে একটি সাধারণ ডায়েরি দায়ের করেন।
অঞ্জনার প্রথম কাজটি একজন পশুচিকিৎসকের মাধ্যমে হয়েছিল, যিনি অঞ্জনার প্রশিক্ষণের কথা শুনেছিলেন। অঞ্জনা বলেন, এটা ছিল আমার জীবনের সবচেয়ে ভয়ঙ্কর দিন। আমার হাত কাঁপছিল। ব্যর্থ হলে কী হবে তা ভেবে আমি ভীত ছিলাম। কিন্তু গর্ভধারণ কাজ করেছিল এবং গাভীটি গর্ভবতী হয়েছিল।
অঞ্জনার সাফল্যও সমালোচকদের তাৎক্ষণিকভাবে চুপ করিয়ে দিতে পারেনি। লোকেরা বলত, তিনি একজন নারী হওয়ায় এই কাজে সফল হবেন না। কিন্তু অঞ্জনা দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিলেন তাঁর কাজই তাঁর হয়ে কথা বলবে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাই হয়ে ওঠে। তিনি একটি পাকা বাড়ি তৈরি করেন, তাঁর ছেলের লেখাপড়ার খরচ বহন করেন এবং তাঁর গ্রাহকদের আস্থা অর্জন করেন।
গত বছর অঞ্জনা ১ হাজার ৩৭০টি গরুকে প্রজনন করিয়েছেন। এই বছর তাঁর লক্ষ্য ২ হাজারটি করা। তিনি টিকা দেওয়া ও মৌলিক পশু চিকিৎসা শেখারও পরিকল্পনা করছেন। অঞ্জনা বলেন, ‘এখন সব গুঞ্জন বন্ধ হয়ে গেছে। আরও অনেক নারী এই কাজে যোগ দিয়েছেন। আমি খুশি যে আমি একটি উদাহরণ স্থাপন করতে পেরেছি।’ অঞ্জনার মতে, তাঁর গল্প কেবল বেঁচে থাকার গল্প নয়, বরং দৃঢ় বিশ্বাসের গল্প। সমালোচনা যতই কঠোর হোক না কেন, আপনার দরকার আত্মবিশ্বাস ও কিছুটা সমর্থন।