শরৎ এলে
শরৎ এলে
শরৎকে কোনোদিন ক্যালেন্ডার দেখে আবিষ্কার করা হয়নি। শরৎ মানে হঠাৎ একদিন ঘুম থেকে উঠে জানালার পর্দা সরিয়ে মনে হওয়া আজকের আকাশটা অন্যরকম।
নীলটা যেন একটু বেশি নীল, মেঘগুলো একটু বেশি সাদা। বাতাসে আগন্তুক এক গন্ধ, যেটাকে ঠিক কোনো নাম দেওয়া যায় না। মনে হয়, বর্ষা তার ভেজা জামাকাপড় গুটিয়ে চলে যাচ্ছে, আর যাওয়ার আগে ঘরের দরজায় রেখে যাচ্ছে এক মুঠো রোদ।
ছোটবেলায় শরৎ মানেই ছিল ছুটির দিন।
সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখতাম, উঠোনের একপাশে রোদ পড়ে আছে। মা হয়তো কাপড় শুকোতে দিয়েছেন। দূরে কোথাও শিউলি ঝরছে। আর আমি কোনো কাজ না থাকার অপরাধবোধ ছাড়াই অনেকক্ষণ জানালার পাশে দাঁড়িয়ে থাকতাম।
তখন সময়ের কোনো মূল্য বুঝতাম না। ভর দুপুর মানেই দীর্ঘ দুপুর। বিকেল মানে মাঠে যাওয়ার অজুহাত। সন্ধ্যা নামলে বাড়ি ফেরার তাড়া। শরৎ তখন খুব সহজ একটা ঋতু ছিল। তাকে বোঝার দরকার হতো না, শুধু তার মধ্যে থাকা যেত।
বড় হতে হতে সবকিছুই কেমন কঠিন হয়ে গেল। শরৎও।
এখন শরৎ আসে, কিন্তু আমি তাকে ধরতে পারি না। ক্লাস থাকে, অ্যাসাইনমেন্ট থাকে, মেইল থাকে, ফোনে একের পর এক নোটিফিকেশন আসে। কোনোদিন একটা লেখা শেষ করতে করতে রাত হয়ে যায়। কোনোদিন নিজের সঙ্গে কথা বলার সময়টুকুও পাওয়া যায় না। জানালার বাইরে যে আকাশটা একসময় আমার পুরো বিকেল দখল করে রাখত, এখন সেটার দিকে তাকানোর জন্যও আমাকে সময় বের করতে হয়।
তবু শরৎ তার পুরোনো অভ্যাস ছাড়েনি। প্রতি বছর ঠিকই আসে। সেদিনও এসেছিল।
বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ফিরছিলাম। রাস্তার পাশে মানুষজনের ভিড়, গাড়ির হর্ন, ধোঁয়া, ব্যস্ত ঢাকা, সবকিছু আগের মতোই ছিল। শহর শরৎকে খুব একটা পাত্তা দেয় না। এখানে কাশফুলের চেয়ে ট্রাফিক বেশি, পাখির ডাকের চেয়ে হর্ন বেশি, আর আকাশ দেখার চেয়ে স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকা মানুষের সংখ্যা বেশি।
হঠাৎ রিকশাটা একটা মোড় ঘুরতেই চোখে পড়ল, একটা ছোট্ট ফাঁকা জায়গার পাশে কয়েকটা কাশফুল দুলছে। অদ্ভুতভাবে থেমে গেল মনটা। কোনো কারণ ছাড়াই। মনে হলো, এই দৃশ্যটা আমি আগে দেখেছি।
অনেক আগে। হয়তো বহু বছর আগে। হয়তো কোনো এক পড়ন্ত বিকেলে। হয়তো কোনো ছুটির দিনে। হয়তো এমন এক সময়ে, যখন ভবিষ্যৎ নিয়ে আমার কোনো চিন্তা ছিল না। রিকশা মামাকে বললাম, একটু ধীরে যেতে। তিনি অবাক হয়ে তাকালেন। আমি কিছু বললাম না। শুধু কাশফুলগুলোর দিকে তাকিয়ে রইলাম।
সেদিন বুঝলাম, মানুষ আসলে জায়গাগুলোকে খুব একটা মনে রাখে না। মানুষ মনে রাখে সেই বয়সটাকে, যে বয়সে জায়গাগুলোকে প্রথমবার দেখেছিল।
শরৎ আমাকে আমার সেই বয়সটার কাছে ফিরিয়ে নিয়ে গেল। সেই ছোট্ট আমি, যে জানত না বিশ্ববিদ্যালয় কী, ক্যারিয়ার কী, সিজিপিএ কী, ভবিষ্যৎ নিয়ে এত অঙ্ক কষতে হয় কেন। যে শুধু জানত, বিকেলের আকাশ সুন্দর হলে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকতে হয়।
হয়তো বড় হয়ে যাওয়ার সবচেয়ে অদ্ভুত ব্যাপার এটাই আমরা ভবিষ্যৎ নিয়ে এত বেশি ভাবতে শিখি যে, বর্তমানকে দেখার সময়টুকু হারিয়ে ফেলি।
সন্ধ্যায় বাসায় ফিরে ছাদে উঠলাম। ঢাকার আকাশ পুরোপুরি দেখা যায় না এখান থেকে। পাশের বিল্ডিং, তারের জট, অ্যান্টেনা সবকিছু আকাশটাকে টুকরো টুকরো করে রেখেছে।
তবু সেদিন আকাশটা সুন্দর ছিল। একটা সাদা মেঘ ধীরে ধীরে নীলের ভেতর দিয়ে যাচ্ছিল। আমি অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলাম। মনে হলো, শরৎ কোনো ঋতু নয়। শরৎ বরং অমলিন এক স্মৃতি। একটা দরজা, যেটা বছরে একবার খুলে যায়।
তার ওপাশে থাকে আমাদের পুরোনো দিনগুলো যে দিনগুলোতে আমরা এতটা ব্যস্ত ছিলাম না, এতটা বড় হয়ে উঠিনি, এত কিছু হারানোর ভয় জানতাম না।
শরৎ তাই আমার কাছে কাশফুলের চেয়েও বেশি কিছু। এটা মায়ের শুকোতে দেওয়া কাপড়ের গন্ধ। এটা বিকেলে বাড়ি ফেরার রাস্তা। এটা জানালার পাশে বসে থাকা একটা অলস দুপুর। এটা কোনো এক বিকেলে না-বোঝা আনন্দে অনেকক্ষণ আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকা। এটা বহুদিন আগে হারিয়ে যাওয়া একটা বিকেল। আর সবচেয়ে বেশি এটা নিজের কাছে ফিরে আসার একটা ছোট্ট সুযোগ।
প্রতি বছর শরৎ আসে। তাকে ডাকতে হয় না। সে শহরের ধুলো পেরিয়ে, ব্যস্ততার ফাঁক গলে, কোনো এক বিকেলে আমাদের জানালার পাশে এসে দাঁড়ায়। তারপর খুব আস্তে করে বলে,
“তুমি অনেক দূর চলে এসেছ। কিন্তু তুমি যে মানুষটা ছিলে, সে এখনো কোথাও হারিয়ে যায়নি।“
সেদিন ছাদ থেকে নামার সময় আকাশের দিকে আরেকবার তাকালাম। শরৎ তখনও ছিল। আমি জানি, কয়েকদিন পর কাশফুলগুলো ঝরে যাবে। আকাশের মেঘের রং বদলে যাবে। বাতাসে শীতের গন্ধ আসবে। জীবন আবার তার স্বাভাবিক ব্যস্ততায় ফিরে যাবে।
ক্লাস থাকবে, কাজ থাকবে, লেখা থাকবে, ভবিষ্যৎ নিয়ে আবার অঙ্ক কষতে হবে। হয়তো আবার কোনো একদিন ব্যস্ততার মধ্যে দিয়ে হেঁটে যেতে যেতে বুঝব অনেকদিন আকাশের দিকে তাকানো হয়নি।
তবু শরৎকে আমি এবার রেখে দিলাম। যেন ব্যস্ত জীবনের কোথাও একটা ছোট্ট জানালা খোলা থাকে। সেখানে নীল আকাশ থাকে, সাদা মেঘ থাকে, কয়েকটা কাশফুল দোলে। আর সেখানে দাঁড়িয়ে থাকে সেই ছোট্ট আমি যে এখনো জানে, সুন্দর কোনো বিকেল দেখলে সব কাজ কিছুক্ষণের জন্য থামিয়ে দিতে হয়। কারণ কিছু ঋতু ক্যালেন্ডারে আসে না, আসে ভেতরে।
Top stories