এআই কি শিশুদের শেখার পথে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে?

দেখা যায়, এআই ব্যবহারকারী শিক্ষার্থীদের সব বিষয়ে গড় বাড়ির কাজের নম্বর ১৮ শতাংশ বেড়েছে। প্রতিটি কাজ শেষ করতে তাদের সময়ও গড়ে ৬৪ মিনিট থেকে কমে ৪৫ মিনিট হয়েছে। কিন্তু পরীক্ষার সময় একই শিক্ষার্থীরা এআই ব্যবহার না করা সহপাঠীদের তুলনায় ২০ শতাংশ কম নম্বর পেয়েছে।

1748087562577
প্রতীকী ছবি: সংগৃহীত

স্কুলপড়ুয়া শিশু থেকে শুরু করে সব স্তরের শিক্ষার্থীদের মধ্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহারের হার দিন দিন বাড়ছে। এতে একদিকে যেমন কাজে গতি বেড়েছে, অন্যদিকে শিক্ষার্থীদের বিশ্লেষণ ও জটিল সমস্যা সমাধানের আগ্রহ কমছে। এর ফলে প্রশ্ন জাগছে- এআই কি শিশুদের শেখার পথে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে?

এডটেক প্রতিষ্ঠান চেগের গত বছরের এক জরিপে দেখা যায়, উন্নত বিশ্বের বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া শিক্ষার্থীদের ৮০ শতাংশ পড়াশোনায় এআই ব্যবহার করেছে।

ব্রিটেনে সাম্প্রতিক আরও কিছু জরিপে এই হার ৯৪ শতাংশ এবং জার্মানিতে ৯৩ শতাংশ বলে জানা গেছে।

এত ব্যাপক হারে ব্যবহারের ফলে শিক্ষায় এই প্রযুক্তির প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

শিক্ষকেরা জানান, তারা শিক্ষার্থীদের লেখায় অনেক সাদৃশ্য পাচ্ছেন। তাদের ধারণা এগুলো চ্যাটজিপিটির মাধ্যমে তৈরি করা বলেই, এমন সাদৃশ্য দেখা যাচ্ছে।

তবে শিক্ষায় এআইয়ের প্রভাব নিয়ে এত দিন কোনো শক্ত প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

এই বিষয়টি নিয়ে গবেষণা করেন স্টকহোম বিশ্ববিদ্যালয়ের ডেভিড স্ট্রমবার্গ এবং হংকং বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিক্টর লেই ও উ ইয়ানহুই।

তারা চীনের ১২ থেকে ১৮ বছর বয়সী ২৭ হাজার শিক্ষার্থীর ওপর এআই ব্যবহার প্রবণতা বিশ্লেষণ করেন।

‘দ্য জেনারেটিভ এআই লার্নিং পেনাল্টি: এভিডেন্স ফ্রম চাইনিজ সেকেন্ডারি এডুকেশন’, জুন ২০২৬-এর প্রিপ্রিন্ট। গবেষণাটি ২ জুন ২০২৬ প্রকাশিত হয়েছে। উৎস: ডি. স্ট্রমবার্গ

অন্যান্য দেশের মতো চীনেও এআই ব্যবহারের হার দ্রুত বাড়ছে। দেশটির প্রায় ৮০ শতাংশ শিক্ষার্থী জানায়, তারা দৌবাও ও ডিপসিকের মতো এআই মডেল ব্যবহার করে।

এ গবেষণার ফলাফল বেশ চমকপ্রদ। ছয় মাস পর দেখা যায়, এআই ব্যবহারকারী শিক্ষার্থীদের সব বিষয়ে গড় বাড়ির কাজের নম্বর ১৮ শতাংশ বেড়েছে। প্রতিটি কাজ শেষ করতে তাদের সময়ও গড়ে ৬৪ মিনিট থেকে কমে ৪৫ মিনিট হয়েছে। কিন্তু পরীক্ষার সময় একই শিক্ষার্থীরা এআই ব্যবহার না করা সহপাঠীদের তুলনায় ২০ শতাংশ কম নম্বর পেয়েছে।

আগে বাড়ির কাজের নম্বর দিয়ে পরীক্ষার ফলাফল অনুমান করা যেত। এখন উল্টো দেখা যাচ্ছে, যারা বাড়ির কাজে সবচেয়ে বেশি নম্বর পায়, পরীক্ষায় তাদের খারাপ করার সম্ভাবনাই বেশি।

তাহলে কি স্কুলগুলোতে এআই নিষিদ্ধ করা উচিত? এর উত্তর হবে- মোটেই না।

পরীক্ষার ফলাফল খারাপ হওয়ার যে প্রবণতা দেখা গেছে, তা মূলত সেই শিক্ষার্থীদের মধ্যে বেশি ছিল, যারা বাড়ির কাজ দ্রুত শেষ করেছে। যারা এআই ব্যবহার করেও অন্য শিক্ষার্থীদের মতোই সময় নিয়ে কাজ করেছে, তাদের ক্ষতি খুব সামান্য হয়েছে। অর্থাৎ, বিষয়টি নির্ভর করছে শিক্ষার্থীরা কীভাবে প্রযুক্তিটি ব্যবহার করছে তার ওপর।

যাদের পরীক্ষার ফল ভালো ছিল, তারা শুধু সময় বাঁচাতে উত্তর কপি-পেস্ট করেনি। বরং তারা কঠিন বিষয় বুঝতে বা নির্দিষ্ট সমস্যা সমাধানে সহায়তা নেওয়ার জন্য চ্যাটবটকে ব্যক্তিগত শিক্ষকের মতো ব্যবহার করেছে।

আরেকটি নতুন গবেষণায় মিডলবারি কলেজের জারা কনট্রাক্টর ও জার্মান রেয়েস বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া শিক্ষার্থীদের একটি অপরিচিত বিষয় সম্পর্কে শেখান। একদল শিক্ষার্থী চ্যাটবটের সাহায্য নিয়ে এবং অন্যদল কোনো সাহায্য ছাড়াই বিষয়টি শেখে। এআই ব্যবহারকারী শিক্ষার্থীরা পরীক্ষায় বেশি নম্বর পায়।

প্রমাণ এখনও সীমিত হলেও এসব গবেষণার ফল একটি দিকেই ইঙ্গিত করছে: এআই শেখার উৎপাদনশীলতা বাড়াতে পারে, তবে তা কেবল তাদের জন্য, যারা প্রযুক্তিটি বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে ব্যবহার করে।

তাই শিক্ষার্থীদের উচিত নিজেরা কোনো প্রশ্নের সমাধান করার চেষ্টা না করেই এআইয়ের তৈরি উত্তর ব্যবহারের অভ্যাস বর্জন করা।