image

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে (জাবি) ক্যাম্পাসে চলমান শিশুশ্রম নিয়ে চারুকলা বিভাগের ৫৩তম আবর্তনের শিক্ষার্থী আসিফ রহমানের একক শিল্প প্রদর্শনী ‘Familiar Faces, Unfamiliar Context’ অনুষ্ঠিত হয়েছে।

১৫ সেপ্টেম্বর আল বেরুনী হলের ক্যান্টিনে শুরু হওয়া প্রদর্শনীটি ২০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত চলে। প্রদর্শনীতে ক্যাম্পাসের ক্যান্টিনে কর্মরত শিশুদের জীবন, শ্রেণি বৈষম্য ও শিশুশ্রমের বাস্তবতা বিভিন্ন শিল্পকর্মের মাধ্যমে তুলে ধরা হয়।

প্রদর্শনীর দ্বিতীয় দিনে, ১৬ সেপ্টেম্বর, শিশুশ্রম, শিশু ও অর্থনীতির ওপর এর প্রভাব এবং শিশুশ্রম নির্মূলের সম্ভাব্য উপায় নিয়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের জহির রায়হান মিলনায়তনের সেমিনার কক্ষে একটি আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়।

আলোচনায় অংশ নেন অর্থনীতিবিদ ও শিক্ষক অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ড. মো. শাহীন মোল্লা, জাবির চারুকলা বিভাগের অধ্যাপক ড. এম এম ময়েজউদ্দিন এবং অ্যাকাউন্টিং অ্যান্ড ইনফরমেশন সিস্টেমস বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মেহেদী হাসান। আলোচনা সঞ্চালনা করেন জাবির চারুকলা বিভাগের শিক্ষার্থী এ এম হাবিব উসমান।

অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ বলেন, কোনো শিশু শখ করে শ্রমে যুক্ত হয় না। পরিবারের কাজের নিশ্চয়তা ও পর্যাপ্ত আয় না থাকায় অনেক শিশুকে শ্রমে যুক্ত হতে হয়। তাঁর মতে, শিশুশ্রম শুধু শিশুদের ক্ষতি করছে না, এটি জাতীয় ক্ষতিও তৈরি করছে, কারণ এই শিশুদের মধ্য থেকেই ভবিষ্যতে শিল্পী, বিজ্ঞানী ও অর্থনীতিবিদ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

তিনি বলেন, শিশুশ্রম থেকে বেরিয়ে আসা একটি সামগ্রিক রাষ্ট্রীয় উন্নয়নের বিষয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন, হল, ছাত্র সংগঠন ও শিক্ষক সংগঠনগুলোরও এ বিষয়ে উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। শিশু শ্রমিকদের পড়াশোনার সুযোগ, দক্ষতা উন্নয়ন এবং প্রতিভা বিকাশে আরও সংগঠিত উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক ড. মো. শাহীন মোল্লা বলেন, শিশুশ্রম বন্ধ করতে সরকারের পাশাপাশি এনজিওগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নয়ন ছাড়া সমস্যাটির স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। তিনি বলেন, শিশুশ্রমের কারণে শিশুদের শারীরিক, মানসিক ও সামাজিক স্বাস্থ্য ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং দীর্ঘমেয়াদে ট্রমা, উদ্বেগ, বিষণ্নতা ও হতাশার মতো সমস্যা তৈরি হতে পারে।

প্রদর্শনীর উদ্দেশ্য সম্পর্কে আয়োজক আসিফ রহমান বলেন, আল বেরুনী হলের ক্যান্টিনের প্রায় সব কর্মীই শিশু। তাঁদের ছবির পাশাপাশি হলের শিক্ষার্থী ও বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যক্তিদের ছবি রেখে শ্রেণি বৈষম্যের একটি ভিজ্যুয়াল চিত্র তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে। নিজেরও দায় রয়েছে উল্লেখ করে প্রদর্শনীতে একটি সেল্ফ-পোর্ট্রেট রাখা হয়েছে। দর্শকদের জন্য রাখা হয়েছে একটি আয়না, যাতে তাঁরা শিশুশ্রমের বিষয়ে নিজেদের দায় ও ভূমিকা নিয়ে ভাবতে পারেন।

আল বেরুনী হলের আবাসিক শিক্ষক ও জাবির অ্যাকাউন্টিং অ্যান্ড ইনফরমেশন সিস্টেমস বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মেহেদী হাসান বলেন, এ ধরনের প্রদর্শনী মানুষকে প্রশ্ন করতে এবং আত্মসমালোচনার সুযোগ করে দেয়।

চারুকলা বিভাগের অধ্যাপক ড. এম এম ময়েজউদ্দিন প্রদর্শনীর ব্যতিক্রমী নাম ও বিষয়বস্তুর প্রশংসা করে বলেন, শিল্পীদের সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতা থাকা উচিত। তিনি শিক্ষার্থীদের এ ধরনের আয়োজন অব্যাহত রাখার আহ্বান জানান এবং ভবিষ্যতে সহযোগিতার আশ্বাস দেন।

আয়োজকদের মতে, প্রদর্শনীটি দর্শনার্থীদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে এবং প্রতিদিন কয়েকশ মানুষ এটি দেখতে এসেছেন। প্রদর্শনীর মাধ্যমে শিশুশ্রমের বাস্তবতা নিয়ে আলোচনা তৈরি এবং শিশুদের শ্রম থেকে ফিরিয়ে এনে শিক্ষা ও স্বাভাবিক শৈশবের সুযোগ তৈরির বিষয়ে সামাজিক সচেতনতা বাড়ানোই ছিল আয়োজকের মূল লক্ষ্য।