অ্যাসিডের হিংস্রতা দমাতে পারেনি রত্না মণ্ডলকে
নিজের জীবনকে বদলে দেওয়া সেই রাতের কথা এখনও মনে আছে তার। দুই দশকেরও বেশি সময় কেটে গেছে, তবুও তার ঘাড়ের ক্ষতগুলো মাঝেমধ্যে তাজা মনে হয়, এমনভাবে জ্বালা করে যেন গতকালই অ্যাসিড ছুঁড়ে মারা হয়েছে।
অ্যাসিডের হিংস্রতা দমাতে পারেনি রত্না মণ্ডলকে
নিজের জীবনকে বদলে দেওয়া সেই রাতের কথা এখনও মনে আছে তার। দুই দশকেরও বেশি সময় কেটে গেছে, তবুও তার ঘাড়ের ক্ষতগুলো মাঝেমধ্যে তাজা মনে হয়, এমনভাবে জ্বালা করে যেন গতকালই অ্যাসিড ছুঁড়ে মারা হয়েছে।
১৫ বছর বয়সে অ্যাসিড সন্ত্রাসের শিকার হন রত্না মণ্ডল। সাহসের সঙ্গে নিজের জীবন পুনর্নির্মাণ করেন। এখন তার মতো সংগ্রাম করতে থাকা নারীদের জন্য লড়ছেন রত্না।
নিজের জীবনকে বদলে দেওয়া সেই রাতের কথা এখনও মনে আছে তার। দুই দশকেরও বেশি সময় কেটে গেছে, তবুও তার ঘাড়ের ক্ষতগুলো মাঝেমধ্যে তাজা মনে হয়, এমনভাবে জ্বালা করে যেন গতকালই অ্যাসিড ছুঁড়ে মারা হয়েছে।
রত্না এই ক্ষতগুলো নিয়েই বাঁচতে শিখেছেন, কিন্তু ক্ষতগুলোর কথা কখনও ভুলতে পারেনি।
তিনি বলেন, “আমার ক্ষতগুলো আমাকে ব্যথার নয়, বেঁচে থাকার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছে। এগুলো আমাকে মনে করিয়ে দেয় কেন আমি লড়াই করি।”
দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জেলা ঝিনাইদহের একটি শান্ত গ্রামে রত্না বেড়ে উঠেছেন। আত্মীয়স্বজন, ভাই-বোন নিয়ে যৌথ হিন্দু পরিবার ছিল তাদের। রত্না ছিলেন তিন ভাই-বোনের মধ্যে বড়; আদর, ভালোবাসা ও নিরাপদে বেড়ে ওঠছিলেন।
মেয়ে হওয়ার কারণে বাবা-মা কখনও তার সঙ্গে ভিন্ন আচরণ করতেন না। তিনি বিভিন্ন কাজ করতেন, দায়িত্ব পালন করতেন এবং সংসার চালাতেও সাহায্য করতেন। আটপৌরে জীবন হলেও রত্না ছিলেন সন্তুষ্ট।
স্কুলে পড়ার সময়ই রত্নার সেই সুখ ভেঙে যায়। বাবা ছিলেন গ্রামের প্রভাবশালী ব্যক্তি এবং পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম সদস্য। এক শীতের রাতে দীর্ঘদিনের জমি সংক্রান্ত বিরোধের জের ধরে অন্ধকারে রত্নার বাবার ওপর আক্রমণ হয়।
এই আক্রমণের ফলে তিনি পক্ষাঘাতগ্রস্ত এবং স্থায়ীভাবে শয্যাশায়ী হয়ে পড়েন। রাতারাতি পরিবারের মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ে। আর্থিক অনিশ্চয়তায় পরিবারটি আত্মীয়স্বজনের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে—যারা মনে করিয়ে দিতেন রত্নাদের আর্থিক দুরাবস্থার কথা।
রত্নাদের জন্য অপমান নিয়মিত ব্যাপার ছিল। কিশোরী রত্না তখনো পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছিল, কিন্তু বাড়ির ভেতরের দুশ্চিন্তা দিন দিন বেড়েই যাচ্ছিল। তারপর এল ১৯৯৯ সাল।
ওই বছরই রত্নার দাদু মারা যান। আত্মীয়স্বজনরা শেষকৃত্য করতে তাদের বাড়িতে আসেন। ঘর ভর্তি মানুষ থাকায় রত্না বাইরের বারান্দায় ঘুমিয়ে পড়ে। তার বয়স ছিল ১৫। মধ্যরাতের কিছু পরে অসহ্য যন্ত্রণায় তার ঘুম ভেঙে যায়। রত্নার ঘাড় এবং মুখ ঝলসে গিয়েছিল। অ্যাসিড ও পোড়া মাংসের গন্ধে বাতাসে ভরে গেল। সে চিৎকার করে উঠল, কিন্তু কেউ কিছুই করতে পারল না। পানি ঢালায় ব্যথা আরও বেড়ে গেল। কী ঘটেছে তা বোঝার আগেই রত্না অজ্ঞান হয়ে যায়।
রত্নাকে ঝিনাইদহের হাসপাতালে ভর্তি করা হলো। পরে চিকিৎসার জন্য ভারতে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তিনি ছয় মাস ব্যান্ডেজ জড়িয়ে কাটিয়েছিলেন, এমন চিকিৎসার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছিল, যা একজন কিশোরীর পক্ষে সহ্য করা ছিল কঠিন। যখন তিনি বাড়ি ফিরে আসেন, তখন সত্যটি জানতে পারেন। তার বাবার জীবন ধ্বংস করে দেওয়া একই বিরোধের অংশ হিসেবে তার ওপর আক্রমণ করা হয়।
কিন্তু নিষ্ঠুরতা সেখানেই শেষ হয়নি। গ্রামে গুঞ্জন ছড়িয়ে অ্যাসিড হামলার ঘটনাটিকে অন্য কিছুতে রূপান্তর করা হয়। গুজব ছড়িয়ে পড়ে রত্না একটি গোপন প্রেমের সম্পর্ক ছিলেন এবং তিনি একজন পুরুষকে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। এই আক্রমণটি সেই প্রতিশোধের জন্য করা হয়েছিল।
অনেক মানুষের মনে অ্যাসিড আক্রমণকে ‘প্রেমের সম্পর্কের করুণ পরিণতি’ হিসেবে মেলানো হয়েছিল এবং গ্রামবাসী এটি বিশ্বাস করেছিলেন। রত্না এটিকে তার জীবনের সবচেয়ে বেদনাদায়ক স্মৃতি হিসেবে বর্ণনা করেন।
রত্না বলেন, “তারা আমাকে আক্রমণ করেছে এটাই যথেষ্ট ছিল না। তারা আমার চরিত্রও কেড়ে নিয়েছে। আমার বয়স তখন মাত্র ১৫ বছর। আমি ভালোবাসা বা সম্পর্ক কী তাও বুঝতাম না।”
লজ্জিত হয়ে স্কুলে যাওয়া বন্ধ করে দেন রত্না। ভারতে চিকিৎসার খরচ বহন করার পর তার পরিবার আর্থিকভাবে সমস্যায় পড়ে। আত্মীয়স্বজনরা তাদের বোঝা মনে করতেন। দিনগুলো কষ্টে কাটছিল, ভবিষ্যৎ অন্ধকার মনে হচ্ছিল।
এরই মধ্যে আশার একটা ছোট জানালা খুলে যায়। অ্যাসিড আক্রমণে আহতদের পুনর্বাসনের জন্য কাজ করা একটি জাতীয় সংবাদপত্র তাকে খুঁজে পায় এবং তার বাড়ির কাছে একটি ছোট মুদির দোকান স্থাপনে সহায়তা করে। এটি খুব সাধারণ ব্যবসা ছিল, কিন্তু রত্নার কাছে এর মানে ছিল আরও বড় কিছু, এটি ছিল তার কাছে স্বাধীনতা। সেই থেকে অর্থ উপার্জন করতে শুরু করেন রত্না এবং পরিবারের জন্য অবদান রাখতে শুরু করেন।
রত্নার শিক্ষক ও বন্ধুরা তাকে আবারও স্কুলে যেতে অনুরোধ করেন। রত্না প্রথমে তা প্রত্যাখ্যান করেছিলেন, এই ভেবে যে লোকেরা তার ক্ষতচিহ্নের দিকে তাকিয়ে থাকবে।
কিন্তু তার শিক্ষকেরা বললেন, “তুমি এর চেয়েও শক্তিশালী।” এই কথাগুলোই রত্নাকে তার জীবনে এগিয়ে যাওয়ার জন্য অনুপ্রাণিত করে।
রত্না পুনরায় স্কুলে ফিরে গেলেন। সকালে দোকানে কাজ করতেন আর বিকেলে পড়াশোনা। ধীরে ধীরে, তিনি আত্মবিশ্বাস ফিরে পেতে লাগলেন। স্কুল জীবন শেষে রত্না নিজের ও ভাইবোনদের উচ্চশিক্ষার জন্য পরিবারকে নিয়ে ঝিনাইদহ শহরে চলে যান।
ভর্তি হন কলেজে, ছাত্রদের টিউশন করার চাকরি নেন এবং নিজের পড়াশোনা চালিয়ে যেতে থাকেন।
অবশেষে স্নাতক এবং স্নাতকোত্তর ডিগ্রি সম্পন্ন করেন রত্না, যা একসময় তার কাছে অসম্ভব বলে মনে হত। সেই বছরগুলোতে অ্যাসিড সারভাইভারস ফাউন্ডেশন তার চিকিৎসা এবং থেরাপিতে সহায়তা করেছিল, যা তার পরিবারের বোঝা অনেকটা লাঘব করে।
২০১৮ সালে রত্নার জীবনে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটে। তিনি ব্র্যাকের মানবাধিকার ও আইনগত সহায়তা পরিষেবা (এইচআরএলএস) প্রোগ্রামে যোগ দেন। তিনি আর কেবল একজন অ্যাসিডদগ্ধ নন, এখন একজন আইনজীবীও।
বর্তমানে রত্না খুলনার এইচআরএলএসের কর্মকর্তা হিসেবে পারিবারিক সহিংসতা, ধর্ষণ, অ্যাসিড আক্রমণ, যৌন হয়রানির মতো ঘটনার শিকার নারীদের সহায়তা করছেন। তিনি ভুক্তভোগীদের আইনি প্রক্রিয়ায় দিকনির্দেশনা দেন, তাদের সহায়তা পেতে পাশে থাকেন এবং সমাজ যাদের চুপ করিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে, তাদের পাশে দাঁড়ান।
রত্না বলেন, “অনেক নারী ভেঙে পড়েন। তারা মনে করেন সহিংসতা তাদের প্রাপ্য। তারা মনে করেন কেউ তাদের পাশে দাঁড়াবে না। আমি তাদের বলি, তোমরা একা নাও। তোমাদের সঙ্গে যা ঘটেছে তা তোমাদের দোষে নয়।”
রত্নার নিজের যাত্রা বেঁচে থাকাদের শক্তি দেয়। যখন তারা রত্নার ক্ষত দেখেন, তারা প্রমাণ পেয়ে যান যে, সহিংসতার পরেও বেঁচে থাকা সম্ভব।
রত্না নিজের পরিবারের জন্য যা করতে পেরেছেন, তাতে তিনি গর্বিত। নিজের ভাইবোনদের উচ্চশিক্ষায় সাহায্য করেছেন, তারা দুজনই এখন নিজেদের ক্যারিয়ার গড়েছেন। একসময় ভেঙে পড়া রত্নার পরিবার এখন আবার মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছে।
রত্না বলেন, “মানুষ আমাকে ধ্বংস করার চেষ্টা করেছিল। তারা আমার ত্বকে দাগ রেখে গেছে, কিন্তু আমার উচ্চাকাঙ্ক্ষায় নয়।”
এমন কিছু মুহূর্ত ছিল যখন যন্ত্রণা রত্নাকে শেষ সীমানায় ঠেলে দিয়েছিল, যখন বেঁচে থাকার চেয়ে নিজের জীবন শেষ করে দেওয়া সহজ মনে হয়েছিল। কিন্তু তিনি সাহস খুঁজে পেয়েছিলেন। তাতে ভর করেই এগিয়ে যেতে থাকেন তিনি। আর এখন তিনি লড়ছেন, যাতে অন্য নারীরা আশা না হারান।
রত্না বলেন, “আমার মতো নারীদের হাল ছেড়ে দেওয়া উচিত নয়। আমরা পরিবর্তন আনতে পারি। আমাদের কষ্টই আমাদের গল্পের শেষ নয়। আমরা নতুন করে গল্প লিখতে পারি।”
রত্নার স্বপ্ন খুবই সহজ। এমন একটি পৃথিবী, যেখানে কোনো মেয়েই রত্নার মতো কষ্টের শিকার হবেন না। এমন একটি পৃথিবী যেখানে অ্যাসিড দগ্ধ ব্যক্তিদের ওপর বিশ্বাস রাখা হবে, সমর্থন জানানো হবে এবং তাদের সঙ্গে মর্যাদাপূর্ণ আচরণ করা হবে।
আদালত কক্ষ, থানা, জনাকীর্ণ বাড়ি যেখানে তর্ক-বিতর্ক হিংসাত্মক হয়ে ওঠে, সেখানেই ভুক্তভোগীর পাশে দাঁড়িয়ে যান রত্না। তিনি শোনেন, পরামর্শ দেন, পথ দেখান এবং লড়াই করেন, কারণ রত্না জানেন কেউ পাশে না থাকলে কেমন লাগে।
রত্নার ক্ষতগুলোর মতো তার মানসিক শক্তিও স্থায়ী। রত্না বলেন, “আমি ১৫ বছর বয়সে অ্যাসিড আক্রমণ থেকে বেঁচে গিয়েছিলাম। এখন আমার বয়স ৩৭। আমি এখনও লড়াই করছি, কিন্তু এখন আমি অন্যদের জন্য লড়াই করছি।”