একটি স্কুলের অপেক্ষায় ছয়টি পাহাড়ি গ্রাম
পাহাড়ের আঁকাবাঁকা পথ পেরিয়ে শোনা কিছু চাপা কান্না, কিছু না-পাওয়ার গল্প এবং ২৩০ শিশুর চোখে শিক্ষার আলো জ্বালানোর এক স্বপ্ন।
একটি স্কুলের অপেক্ষায় ছয়টি পাহাড়ি গ্রাম
পাহাড়ের আঁকাবাঁকা পথ পেরিয়ে শোনা কিছু চাপা কান্না, কিছু না-পাওয়ার গল্প এবং ২৩০ শিশুর চোখে শিক্ষার আলো জ্বালানোর এক স্বপ্ন।
বিকেলের আলো তখন ধীরে ধীরে পাহাড়ের বুক থেকে হারিয়ে যাচ্ছে। বাইকের ইঞ্জিনের শব্দ তুলে ছুটে চলেছি এক অজানা গন্তব্যের দিকে। গন্তব্য দুর্গম পাহাড়ের কোলে লুকিয়ে থাকা একটি জনপদ। যেখানে যাওয়ার আমন্ত্রণ পেয়েছি দীর্ঘ আড়াই বছর ধরে। অথচ কর্মব্যস্ততার কারণে এত দিন যাওয়া হয়ে ওঠেনি।
আমন্ত্রণ জানিয়েছিল আমার এক শুভাকাঙ্ক্ষী—রেংথন ম্রো। ইনবক্সে তার প্রতিটি বার্তার শব্দের ভেতর যেন লুকিয়ে ছিল একেকটি দীর্ঘশ্বাস, একেকটি চাপা কান্না। বারবার সে আমাকে বোঝাতে চেয়েছে তাদের জীবনের বাস্তবতা। তার কথাগুলো আজও কানে বাজে
“স্বাধীনতার ৫৫ বছর পরও আমাদের এখানে কোনো মুমূর্ষু রোগীকে হাসপাতালে নিতে হয় মানুষের কাঁধে। আর একটি শিশুকে পড়ালেখা করতে পাড়ি দিতে হয় অন্য উপজেলায়।” কথাগুলো নিছক কোনো অভিযোগ ছিল না। ছিল দীর্ঘদিনের বঞ্চনা, অসহায়ত্ব আর রাষ্ট্রের কাছে কিছু মৌলিক অধিকার পাওয়ার আকুতি।
অবশেষে সেই না-দেখা জনপদের মানুষের গল্প নিজের চোখে দেখতে রওনা হলাম। লামা থেকে প্রথমে চিম্বুক পাহাড়ের ওয়াই-জাংশন, সেখান থেকে আরও ১৭ কিলোমিটার দূরে মুরুং বাজার। সেদিন স্কুল শেষ করে রওনা হওয়ায় ওয়াই-জাংশনে পৌঁছাতে সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টা বেজে গেল। পাহাড়ি একটি দোকানে চা-নাশতা সেরে আবার বাইকে চেপে বসলাম। সঙ্গে রুইতন ম্রো ও মংরে মারমা।
চারপাশ তখন অন্ধকারে ডুবে গেছে। পাহাড়ের আঁকাবাঁকা পথ ধরে বাইকের হেডলাইটের আলোয় এগিয়ে চলেছি আমরা। গল্প করতে করতে রাত পৌনে আটটায় পৌঁছালাম মুরুং বাজারে। সেখানে অপেক্ষা করছিল রেংথন। আমাকে দেখেই হাসিমুখে বলে উঠল,— অবশেষে আসলেন দাদা!
তার হাসিতে ছিল দীর্ঘদিনের অপেক্ষার আনন্দ। কিছুক্ষণ বাজারের একটি দোকানে রং চা পান করলাম। চায়ের কাপ হাতে গল্প করতে করতেই রেংথন বলল, — দাদা, এবার আমাদের উঠতে হবে। আমি অবাক হয়ে প্রশ্ন করলাম, — কেন? কোথায় যাব? রেংথন জানাল, এখান থেকে আর বাইক যাবে না। শুরু হবে হাঁটার পথ। ঘড়িতে তখন রাত ৮টা ১৫ মিনিট। মোবাইলের আলো জ্বালিয়ে শুরু হলো আমাদের পাহাড়ি অভিযান। প্রথমে খাড়া সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামতে হলো। এরপর ছাংও ঝিরি পার হয়ে ধানক্ষেতের আইল ধরে হাঁটতে শুরু করলাম আমরা চারজন।
চারপাশে নিস্তব্ধতা। জোনাকির মিটিমিটি আলো, ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক আর রাতের পাহাড়ি বাতাস আমাদের পথের সঙ্গী। কিছুদূর যাওয়ার পর সামনে দেখা মিলল একটি পাহাড়ের। দূর থেকে দেখে মনে হয়েছিল খুব একটা উঁচু নয়। কিন্তু উঠতে শুরু করতেই বুঝলাম পাহাড়ের আসল রূপ। হাঁপিয়ে উঠছিলাম বারবার। কয়েকবার বিশ্রাম নিতে হলো সবাইকে।
পাহাড় ডিঙিয়ে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে আবার হাঁটা শুরু করলাম। প্রায় ২০ মিনিট পর পৌঁছালাম ক্রাতপুং পাড়ায়। পাড়ায় প্রবেশ করতেই কুকুরের ঘেউ ঘেউ শব্দে আমাদের অভ্যর্থনা জানানো হলো। রেংথনকে জিজ্ঞেস করলাম, — এই পাড়ায় কত পরিবার থাকে? সে জানাল, ১৮টি পরিবার। সবাই ম্রো সম্প্রদায়ের।
পানি পান করে আবার হাঁটা শুরু করলাম। পাড়া থেকে নিচে নামতেই দেখা মিলল একটি ঝিরির। নাম মাসমুই ম্রং। মারমা ভাষায় যার অর্থ রাজকন্যা ঝিরি। ঝিরির শীতল পানিতে পা ভিজিয়ে এগিয়ে চললাম। ঝিরিপথ শেষ হতেই সামনে আবার তেংচুতলং পাহাড়। রেংথন জানাল, — দাদা, এই পাহাড়টা উঠলেই আমাদের পাড়া।
পাহাড়, ঝিরি আর পাহাড় ডিঙিয়ে অবশেষে রাত সাড়ে ১১টায় ছুইছুইতে পৌঁছালাম—রেংথনের গ্রামে। চারপাশ নিস্তব্ধ। পুরো গ্রাম ঘুমিয়ে আছে।
রাতের নীরবতা ভেঙে শুরু হলো মানুষের গল্প
রেংথনের বাড়িতে ব্যাগপত্র রেখে আমরা তিনজন গোসল করতে গেলাম। ঠিক তখনই হঠাৎ বেজে উঠল মাইক। রেংথন তার মাতৃভাষা (ম্রো ভাষায়) কিছু একটা ঘোষণা করছে। ভাষাটি বুঝতে পারছিলাম না। পরে সফরসঙ্গী রুইতন ম্রো জানাল, রেংথন গ্রামের মানুষদের বলছে— “আমার বাড়িতে তিনজন অতিথি এসেছেন। আপনারা ঘুমিয়ে পড়লেও একটু কষ্ট করে আমার বাড়িতে আসুন।”
গোসল শেষ করে বাড়িতে ফিরে দেখি এক বিস্ময়কর দৃশ্য। পাড়ার প্রায় প্রতিটি বাড়ি থেকে পরিবারের কর্তারা এসেছেন। কারও চোখে কৌতূহল, কারও মুখে প্রশ্ন, আবার কারও চোখেমুখে দীর্ঘদিনের জমে থাকা অভিমান।
কেন এসেছি আমরা? কেন রেংথন এত দিন ধরে আমাকে তাদের গ্রামে আসার আমন্ত্রণ জানিয়ে যাচ্ছে? রেংথন ম্রো ভাষায় সবাইকে বিষয়টি বুঝিয়ে বলল। এরপর শুরু হলো মানুষের গল্প শোনা।
একেকজন একেকভাবে বলতে লাগলেন তাঁদের বুকে জমে থাকা কষ্টের কথা। কেউ ম্রো ভাষায়, কেউ মারমা ভাষায়, আবার কেউ বাংলায়। ভাষা আলাদা হলেও সবার কথার অর্থ ছিল এক—তাঁরা বঞ্চিত, তাঁরা অসহায়, তাঁরা রাষ্ট্রের মৌলিক নাগরিক সুবিধা থেকে অনেক দূরে।
এক পর্যায়ে পাড়া প্রধান সাইতন ম্রো বলে উঠলেন, “আমাদের এখানে কিছুই নেই। নেই ভালো রাস্তাঘাট, নেই কোনো স্কুল। আমাদের ছেলে-মেয়েদের পড়ালেখা করতে যেতে হয় রোয়াংছড়ি কিংবা রুমা উপজেলায়। সেখানে হোস্টেলে অথবা বৌদ্ধ বিহারে থেকে পড়াশোনা করতে হয়।” কথাগুলো বলার পর তিনি যেন কিছুটা থামলেন। তারপর করুণ কণ্ঠে একটি প্রশ্ন করলেন— “আমাদের এখানে কি কোনো দিন স্কুল হবে না?” প্রশ্নটি খুব সাধারণ। অথচ এর ভেতরে লুকিয়ে ছিল কত বছরের অপেক্ষা, কত বাবা-মায়ের অসহায়ত্ব, কত শিশুর অপূর্ণ স্বপ্ন!
আমি নির্বাক হয়ে বসে রইলাম। সেদিন তাঁদের প্রত্যেকের মুখের দিকে তাকিয়ে শুধু শুনেছি। তাঁরা মন খুলে বলেছেন। বুঝিয়ে দিতে চেয়েছেন, কীভাবে শিক্ষা, চিকিৎসা ও অন্যান্য মৌলিক নাগরিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়ে তাঁরা জীবন কাটাচ্ছেন।
তাঁরা সবাই জুমচাষি। পাহাড়ের বুকে ঝড়-বৃষ্টি আর তপ্ত রোদ উপেক্ষা করে ফসল ফলান। সেই ফসল থুরুংয়ে মাথায় নিয়ে তিন ঘণ্টার পথ পাড়ি দিয়ে বাজারে বিক্রি করতে যান। অথচ পরিশ্রমের তুলনায় ন্যায্য মূল্যটুকুও পান না।
ফসল বিক্রির সামান্য অর্থ দিয়ে চলে সংসার। একদিন জুমে কাজ করতে না পারলেও যাঁদের খাবারের জোগান নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়তে হয়, তাঁদের জীবনে সন্তানদের পড়ালেখার খরচ বহন করা কতটা কঠিন—তা সহজেই অনুমেয়।
আরেকটি পাড়া, আরেকটি বঞ্চনার গল্প
পরদিন, ৯ অক্টোবর। বিকেলের দিকে মার্কিন পাড়া থেকে বিদায় নিয়ে রওনা হলাম মংঞো পাড়ার উদ্দেশে। প্রায় আধা ঘণ্টা পাহাড়ি মেঠোপথ পেরিয়ে পৌঁছালাম ২৮টি পরিবার নিয়ে গড়ে ওঠা খুমি সম্প্রদায়ের ছোট্ট ছিমছাম জনপদে। ঘড়িতে তখন বিকেল সাড়ে পাঁচটা ছুঁইছুঁই।
পথে দেখা হলো লুথুং খুমির সঙ্গে। তিনি আমাদের নিয়ে গেলেন পাড়া প্রধান (কারবারি) নয়রিং খুমির কাছে। তাঁর সঙ্গে কথা বলে জানতে চাইলাম পাড়ার শিক্ষা, চিকিৎসা ও নিরাপদ পানীয় জলের অবস্থা। নয়রিং খুমি জানালেন, তাঁদের সবচেয়ে বড় সমস্যাগুলোর একটি হলো পানীয় জল। শুষ্ক মৌসুমে পানির জন্য রীতিমতো সংগ্রাম করতে হয়। চিকিৎসার অবস্থা আরও করুণ। শিশুদের টিকা দিতে হলেও প্রায় দুই ঘণ্টা পায়ে হেঁটে যেতে হয় ঘেরাওমুখ পাড়ায়।
শিক্ষার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি জানালেন, পাড়ায় একটি পাড়া কেন্দ্র রয়েছে। দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর কয়েক দিন হলো আবার চালু হয়েছে। সেখানে প্রাক-প্রাথমিক, প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণি পর্যন্ত পাঠদান করা হয়। একটি ছোট্ট পাড়ার মানুষের কাছে এটুকুই যেন বড় প্রাপ্তি। কিন্তু এরপর? দ্বিতীয় শ্রেণির পর শিশুদের শিক্ষার পথ কোথায় গিয়ে শেষ হবে, সেই প্রশ্নের উত্তর যেন কারও জানা নেই।
ছয়টি গ্রাম, ২৩০টি শিশুর অপেক্ষা
মার্কিন পাড়া ও মংঞো পাড়ার মানুষের সঙ্গে কথা বলে বুঝতে পারলাম, সমস্যাগুলো শুধু এই দুটি গ্রামের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ক্রাতপুং, পাসিং, বাগী ও পুরাতন মংঞো পাড়ার মানুষও একই বাস্তবতার শিকার। এই ছয়টি পাড়ায় প্রায় ৯০টির বেশি পরিবার বসবাস করে। সেখানে ৪ থেকে ১২ বছর বয়সী শিশুর সংখ্যা ২৩০ জনেরও বেশি।
একবার ভাবুন, স্বাধীনতার ৫৫ বছর পার হয়ে গেলেও এই ছয়টি গ্রামের শিশুদের জন্য এখনো একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়নি! শিক্ষার আলো পেতে শিশুদের যেতে হয় রোয়াংছড়ি কিংবা রুমা উপজেলার বিভিন্ন আবাসিক প্রতিষ্ঠান ও বৌদ্ধ বিহারে। সন্তানদের পড়ালেখা চালিয়ে নিতে প্রতিটি জুমিয়া পরিবারকে বছরে প্রায় ১৪ থেকে ১৫ হাজার টাকা ব্যয় করতে হয়।
যে পরিবারগুলো একদিন জুমে কাজ করতে না পারলে খাবারের জোগান নিয়ে চিন্তায় পড়ে, সেই পরিবারগুলোর জন্য বছরে এত টাকা খরচ করা কত বড় চ্যালেঞ্জ, তা কি আমরা একবারও ভেবে দেখেছি? ফলে অনেক শিশু শিক্ষাজীবন শুরু হওয়ার আগেই ঝরে পড়ে। কেউ কেউ বাবা-মায়ের সঙ্গে জুমে কাজ করতে শুরু করে।
একটি শিশুর হাতে যেখানে বই-খাতা থাকার কথা, সেখানে তার হাতে উঠে আসে জুমের সরঞ্জাম। যে বয়সে তার বিদ্যালয়ের আঙিনায় ছোটাছুটি করার কথা, সে বয়সেই তাকে শিখতে হয় পাহাড়ের কঠিন জীবনসংগ্রাম।
শুধু শিক্ষা নয়, চিকিৎসা, নিরাপদ পানীয় জল এবং উন্নত সড়ক যোগাযোগের অভাবও প্রতিনিয়ত তাঁদের জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলছে। ছয়টি গ্রামের মানুষের চাওয়া খুব বেশি নয়। তাঁরা চান একটি বিদ্যালয়, চিকিৎসার সহজ ব্যবস্থা, নিরাপদ পানীয় জল এবং চলাচলের উপযোগী রাস্তা। তাঁরা চান রাষ্ট্রের উন্নয়নের মূল স্রোতে যুক্ত হতে।
একটি প্রশ্ন, যা আমাকে ফিরতে দেয়নি আগের জীবনে
সেখান থেকে ফিরে আসার পরও সাইতন ম্রো সেই প্রশ্নটি বারবার কানে বাজছিল— “আমাদের এখানে কি কোনো দিন স্কুল হবে না?”
মনে হচ্ছিল, প্রশ্নটি শুধু একজন পাড়া প্রধানের নয়। এটি ছয়টি গ্রামের ২৩০টি শিশুর প্রশ্ন। এটি শতাধিক বাবা-মায়ের প্রশ্ন। এটি সেইসব মানুষের প্রশ্ন, যাঁরা স্বাধীন দেশের নাগরিক হয়েও মৌলিক অধিকার পাওয়ার অপেক্ষায় প্রজন্মের পর প্রজন্ম কাটিয়ে দিচ্ছেন।
স্বাধীনতার ৫৫ বছর পরও যেখানে একটি শিশুকে পড়ালেখা করতে অন্য উপজেলায় যেতে হয়, যেখানে একজন মুমূর্ষু রোগীকে হাসপাতালে পৌঁছাতে তিন ঘণ্টা মানুষের কাঁধে বহন করতে হয়, সেখানে উন্নয়নের সুফল কতটা মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছেছে—সে প্রশ্ন থেকেই যায়।
এই অভিজ্ঞতা আমাকে ভীষণভাবে নাড়া দিয়েছে। ফিরে এসে পরিচিতজনদের কাছে ছয়টি গ্রামের মানুষের বঞ্চনা, অসহায়ত্ব আর স্বপ্নের গল্প তুলে ধরেছি। তাঁদের বোঝানোর চেষ্টা করেছি, এই ২৩০টি শিশুর জন্য একটি বিদ্যালয় কতটা প্রয়োজন।
আমার আহ্বানে সাড়া দিয়েছেন বেশ কয়েকজন শিক্ষানুরাগী ও শুভাকাঙ্ক্ষী। তাঁদের উৎসাহ, সহযোগিতা ও সাহস আমাকে নতুন করে স্বপ্ন দেখিয়েছে। বর্তমানে সেই বিদ্যালয়ের নকশা তৈরির কাজ চলছে।
আমি জানি, পথটি সহজ নয়। একটি বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করতে প্রয়োজন অর্থ, পরিকল্পনা, সম্মিলিত উদ্যোগ এবং নিরবচ্ছিন্ন প্রচেষ্টা। তবু আমি আশাবাদী।
বিশ্বাস করি, একদিন এই পাহাড়ের বুকেও গড়ে উঠবে একটি বিদ্যালয়। ভোরের আলো ফুটতেই ছোট ছোট শিশুরা বই-খাতা হাতে ছুটে যাবে সেই বিদ্যালয়ের আঙিনায়। পাহাড়ের নীরবতা ভেঙে ভেসে আসবে শিশুদের পড়ার শব্দ। কোনো বাবা-মাকে আর সন্তানের শিক্ষার জন্য দূর উপজেলায় পাঠানোর দুশ্চিন্তায় রাত কাটাতে হবে না।
সেদিন হয়তো সাইতন ম্রো প্রশ্নের একটি উত্তর আমরা দিতে পারব। হ্যাঁ, আপনাদের এখানেও স্কুল হয়েছে।
আমার কাছে এটি শুধু একটি বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নয়; এটি ২৩০টি শিশুর স্বপ্ন বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা। এটি ছয়টি পাহাড়ি গ্রামের মানুষের দীর্ঘদিনের অপেক্ষার অবসান ঘটানোর প্রত্যয়।
পাহাড়ের দুর্গম পথ পাড়ি দিয়ে সেদিন আমি শুধু একটি গ্রামে যাইনি। ফিরে এসেছি একগুচ্ছ প্রশ্ন, কিছু মানুষের চাপা কান্না আর অনেকগুলো শিশুর ভবিষ্যতের দায়বদ্ধতা নিয়ে। আমি বিশ্বাস করি, খুব শিগগিরই শুভাকাঙ্ক্ষীদের সঙ্গে নিয়ে সেই পাহাড়ি জনপদের শিশুদের জন্য শিক্ষার আলো জ্বালাতে পারব।
কারণ, একটি বিদ্যালয় শুধু একটি ভবন নয়; একটি বিদ্যালয় মানে একটি প্রজন্মের স্বপ্ন, একটি জনপদের পরিবর্তন এবং অন্ধকারের বিরুদ্ধে আলোর প্রথম পদক্ষেপ।
উথোয়াইয়ই মারমা একজন নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষক ও সমাজসেবক, যিনি পাহাড়ি অঞ্চলের পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর শিক্ষা বিস্তারে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। তাঁর প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে; যার মধ্যে ২০২১ সালে লামা সরই ইউনিয়নে চেননৈ প্রাথমিক বিদ্যালয়, ২০২২ সালে নাইক্ষ্যংছড়ি দোছড়ি ইউনিয়নে রেংয়ন পাড়া আশা হোফনূং প্রাথমিক বিদ্যালয়, ২০২৪ সালে লামা সদর ইউনিয়নে পোপা আশা হোফনূং আনন্দময়ী প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং ২০২৫ সালে আলীকদম কুরুকপাতা ইউনিয়নে হুংনৈ ছাত্রাবাস প্রতিষ্ঠিত হয়।