পরীক্ষার আগের রাতে পড়লে কি আসলেই কিছু মনে থাকে?

একটু সৎভাবে ভাবুন তো, পরীক্ষার আগের রাতে তিন-চারটা অধ্যায় গিলে ফেলার পর পরদিন হলে বসে আসলে কতটুকু মনে পড়েছে? 

exam-anxiety

সব পড়া হয়েছিল, নোটগুলো দেখা হয়েছিল, হাইলাইটার দিয়ে রঙিন করা হয়েছিল, কিংবা পৃষ্ঠার একটা ঝাপসা ছবি ভেসে ওঠে মাথায়, তারপরেও প্রশ্নটা দেখে মনে হয়েছে, “এটা কি আদৌ পড়েছিলাম, মনে পড়ছে না কেন?” এই অনুভূতিটা পরিচিত, তাই না?

সমস্যাটা পড়ার পরিমাণে নয়, পড়ার পদ্ধতিতে। আর এই সমস্যার একটা চমৎকার সমাধান দিয়ে গেছেন নোবেলজয়ী পদার্থবিদ রিচার্ড ফাইনম্যান, যাকে বলা হয় ফাইন্ম্যান টেকনিক, বা ফাইনম্যান টেকনিক।

ফাইনম্যান নিজে ছিলেন এমন একজন মানুষ যে শুধু জানলেই তৃপ্ত হতেন না, বুঝতে চাইতেন। তাঁর বিখ্যাত উক্তি ছিল: “কোনো কিছু সত্যিকার অর্থে বোঝার পরীক্ষা হলো সেটা একজন বাচ্চাকে বোঝাতে পারা কিনা।” এই একটা কথার ভেতরেই গোটা টেকনিকের মূল লুকিয়ে আছে।

কাজটা আসলে খুব সহজ। একটা কাগজ নিন, যে বিষয়টা পড়েছেন সেটা বইয়ের ভাষায় নয়, একদম নিজের ভাষায় লিখতে শুরু করুন; এমনভাবে, যেন আপনি কাউকে বোঝাচ্ছেন যে বিষয়টা কখনো পড়েনি। যেখানে আটকে যাবেন, বুঝবেন ওখানেই ফাঁকটা আছে। তখন বই খুলুন, সেই অংশটা আবার পড়ুন, আবার নিজের ভাষায় লিখুন। এতটুকুই।

শুনতে সহজ লাগছে। কিন্তু এটা করতে বসলেই টের পাওয়া যায় কত জায়গায় আসলে বোঝা নেই। আমরা অনেক কিছু পড়ি, কিছুটা আবছা মনে থাকে, মনে হয় বুঝেছি; কিন্তু নিজের ভাষায় লিখতে গেলেই সব ভেঙে পড়ে। এটাই এই টেকনিকের মূলমন্ত্র। এটা আপনাকে মিথ্যা আত্মবিশ্বাস থেকে বের করে এনে সত্যিকারের বোঝার দিকে নিয়ে যায়।

২০২৩ সালে আল হিকমাহ-র গবেষক মোজেস আদেলেকে আদেওয়ে-এর একটি গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়েছে থিংকিং স্কিল অ্যান্ড ক্রিয়েটিভিটি জার্নাল -এ, যেখানে দেখা গেছে এই টেকনিক শুধু ভালো শিক্ষার্থীদের জন্য নয়, যারা পড়ালেখায় বেশি সময় লাগে তাদের জন্যেও সমানভাবে কার্যকর। গবেষণায় দেখা গেছে, যে শিক্ষার্থীরা ফাইনম্যান টেকনিক ব্যবহার করেছে তাদের একাডেমিক পারফরম্যান্স উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে এবং নিজেদের সক্ষমতার ওপর আত্মবিশ্বাস তৈরি হয়েছে। একটি fMRI গবেষণায় এমনকি দেখা গেছে, এই পদ্ধতিতে পড়ার সময় মস্তিষ্কের বোঝার ও স্মৃতিধারণের সঙ্গে সম্পর্কিত অংশগুলো বেশি সক্রিয় হয়।

এখন একটু বাস্তব কথা বলি। স্কট এইচ. ইয়ং, যিনি এই টেকনিককে সারা বিশ্বে জনপ্রিয় করেছেন তাঁর লেখালেখির মাধ্যমে, তিনিও সাফ বলেছেন: এটা সব কিছুতে ব্যবহার করতে গেলে সময় নষ্ট হবে। প্রতিটা ছোট বিষয়ের জন্য কাগজ বের করে বসার দরকার নেই। যে জায়গাটা সত্যিই বুঝতে পারছেন না, যেটা না বুঝলে পুরো অধ্যায়টাই ঘুরে যাবে, সেখানেই এটা প্রয়োগ করুন। বাকি সময় প্র্যাকটিস প্রবলেম করুন, অনুশীলন করুন; শুধু নিজেকে বোঝানোর মধ্যে আটকে থাকলে চলবে না।

হতে পারে, আপনার হয়তো যেই টপিক পড়তে হবে, সেটা বই পড়েও ভালো বুঝতে পারছেন না। তারও সমাধান আছে এখন। এখন এমন কোন বিষয় নেই যার টিউটোরিয়াল ইউটিউবে পাওয়া যায় না, একটু সময় নিয়ে সেগুলো দেখলে অনেকটুকুই উপকার হবে। একটা ভিডিও দেখে না বুঝলে আরেকটা দেখবেন, এভাবে করে আপনি ঐ টপিকের বিভিন্ন ফাঁকফোকর নিয়েও জেনে যাবেন। 

আবার, এলএলএম এর যুগে এসে এটাও একটা ভালো পদ্ধতি – চ্যাটজিপিটি, পারপ্লেক্সিটি কিংবা কুয়েন এর মতো এলএলএম-গুলোতে আপনি ঠিক করে বলবেন ঠিক কোন টপিকের কোন পয়েন্ট বুঝতে কষ্ট হচ্ছে। ভালো ভালো উদাহরণ দিয়ে বোঝাতে বললে অনেকটুকুই সাহায্য করে দেয় এসব এআই। আর এতে ভীষণ লাভও হয়, কারণ এখানে আপনার নিজে থেকে বুঝতে হচ্ছে পড়াশোনার বিষয়গুলো, কপিপেস্ট করার মতো কিছু হচ্ছে না এই ক্ষেত্রে। 

একটা ছোট উদাহরণ দিই। ধরুন আপনি প্রবাবিলিটি পড়ছেন। বেইস থিওরাম পড়লেন, সূত্রটা দেখলেন, একটু মাথা নাড়লেন। কিন্তু সত্যিই বুঝলেন কিনা সেটা পরীক্ষা করুন এভাবে: একটা কাগজে লিখুন, বেইস থিওরাম আসলে কী বলছে, এবং কেন এটা দরকার?” কোনো সূত্র লেখা নয়, শুধু ব্যাখ্যা। যদি দেখেন দুই লাইন লিখতেই আটকে যাচ্ছেন, তাহলে বুঝবেন বোঝাটা আসলে এখনো পোক্ত হয়নি।

এই পদ্ধতির আরেকটা দারুণ দিক হলো এটা আপনাকে সক্রিয় রাখে। হাইলাইট করা, বারবার পড়া, নোট দেখা – এগুলো প্যাসিভ, মানে আপনি তথ্য শুধু গ্রহণ করছেন। কিন্তু নিজের ভাষায় ব্যাখ্যা করতে গেলে মস্তিষ্ককে কাজ করতে হয়, সংযোগ তৈরি করতে হয়, গ্যাপ খুঁজে বের করতে হয়। এটাই দীর্ঘমেয়াদে জিনিসটা মনে রাখার আসল চাবিকাঠি।

গবেষণাপত্রে এমন একজন শিক্ষার্থীর কথা আছে, নাম মারিয়া, যার লার্নিং ডিসঅ্যাবিলিটি ছিল। গণিত আর বিজ্ঞান বোঝা তার জন্য সত্যিই কঠিন ছিল। ফাইনম্যান টেকনিক ব্যবহার শুরু করার পর সে বলেছে: “আগে মনে হতো তথ্যের চাপে ডুবে যাচ্ছি। কিন্তু এই টেকনিক শেখার পর বুঝলাম, জটিল বিষয়গুলোকে সহজ করে নিলে আমিও বুঝতে পারি। আর যেখানে বুঝছি না, সেটাও ধরতে পারছি।” এরপর সে নিজেই বন্ধুদের পড়া বোঝাতে শুরু করে।

আরেকটু গভীরে গেলে দেখবেন এই টেকনিকের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো, এটা আপনাকে নিজের সঙ্গে সৎ থাকতে শেখায়। পরীক্ষার আগে রাত তিনটায় বই বন্ধ করে মনে হয় “আচ্ছা, এটা বুঝেছি,” কিন্তু আসলে বোঝা হয়েছে কিনা সেটা নিজেই জানি না। ফাইনম্যান টেকনিক এই সেলফ ডিসেপশন-টা ভাঙে। যেটা বলতে পারবেন না, সেটা আসলে আপনি জানেন না, এই সত্যটাকে মুখের ওপর ধরিয়ে দেয়।

তাহলে আজ থেকেই শুরু করুন। একটা কঠিন বিষয় বেছে নিন, একটা কাগজ নিন, আর লিখতে শুরু করুন – একটা ১২ বছরের বাচ্চাকে বোঝানোর মতো করে। দেখুন কতদূর যেতে পারেন। যেখানে থামবেন, সেখান থেকেই আসল পড়াটা শুরু হবে।