এসএসসি পরীক্ষা ২০২৬: ব্যবস্থাপনা, প্রশ্নপত্রে ভুলভ্রান্তি ও প্রাসঙ্গিক কিছু কথা

এসএসসি পরীক্ষার হলে সিসিটিভি স্থাপনসহ সার্বিক ব্যবস্থাপনা প্রশংসার দাবি রাখে। তথাপি, পরীক্ষার শেষ পর্যায়ে এসে প্রশ্নপত্রের মান নিয়ে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মাঝে চরম হতাশা সৃষ্টি হয়েছে।

SSC
ফাইল ছবি: সংগৃহীত

চলতি বছরের ২১ এপ্রিল থেকে শুরু হওয়া এসএসসি পরীক্ষা এখন প্রায় শেষের দিকে। বিএনপি সরকার গঠনের পর ২০০১-২০০৬ মেয়াদের সফল ও আলোচিত শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী এহসানুল হক মিলন এবার শিক্ষামন্ত্রী হচ্ছেন—এমনটি ব্যাপকভাবে অনুমিত ছিল।

শিক্ষামন্ত্রী হওয়ার পর তাঁর কিছু যুগান্তকারী পদক্ষেপ দেশের মানুষকে শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে আশান্বিত করেছে। তাঁর সেই সংলাপ “নকল আর হবে না” তরুণ প্রজন্মের কাছে ভাইরাল হয়েছে।

এর ফলে শিক্ষার্থীরা পুনরায় পড়াশোনার টেবিলে ফিরে এসেছে। এসএসসি পরীক্ষার হলে সিসিটিভি স্থাপনসহ সার্বিক ব্যবস্থাপনা প্রশংসার দাবি রাখে। তথাপি, পরীক্ষার শেষ পর্যায়ে এসে প্রশ্নপত্রের মান নিয়ে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মাঝে চরম হতাশা সৃষ্টি হয়েছে।

প্রথমত, ঢাকা বোর্ডের পদার্থবিজ্ঞান পরীক্ষায় হাতে আঁকা গ্রাফ দেওয়া হয়েছে, যা এই তথ্যপ্রযুক্তির যুগে অত্যন্ত বেমানান। তা সত্ত্বেও বিষয়টি মেনে নেওয়া যেত, কিন্তু পরবর্তীতে ঢাকা বোর্ডের উচ্চতর গণিত পরীক্ষায় প্রশ্নপত্রে রীতিমতো ভুলের মহড়া পরিলক্ষিত হয়েছে।

১. প্রথমে আসি এমসিকিউ প্রসঙ্গে। এমসিকিউ প্রশ্ন এমনভাবে প্রণয়ন করতে হয় যাতে শিক্ষার্থীরা নির্ধারিত সময়ে উত্তর শেষ করতে পারে। এক্ষেত্রে সারা দেশের সাধারণ শিক্ষার্থীদের কথা বিবেচনা না করে প্রশ্নপত্রটি ঢাকা-কেন্দ্রিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ক্যাডেট কলেজ এবং মেধাবী শিক্ষার্থীদের কথা চিন্তা করে করা হয়েছে। ইংরেজি ভার্সনের একটি প্রশ্নে তো পর্যাপ্ত তথ্যই দেওয়া হয়নি। সেখানে প্রশ্ন করা হয়েছিল—ফেব্রুয়ারি মাসে বৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা কত? কিন্তু ফেব্রুয়ারি মাসে কত দিন বৃষ্টি হয়েছে, সেই উপাত্ত উপস্থাপন করা হয়নি। এখানে প্রশ্নকর্তা শিক্ষার্থীদের মান বা স্তর বিবেচনা না করে নিজের মেধাকে তাদের ওপর চাপিয়ে দিয়েছেন।

২. সৃজনশীল অংশের অবস্থা ছিল আরও নাজুক। শিক্ষার্থীরা যে প্রশ্নেরই উত্তর করতে গেছে, সেখানেই ভুল প্রশ্নের সম্মুখীন হয়েছে। এবারের এসএসসি পরীক্ষায় ৮টি অধ্যায় রাখা হয়েছে এবং সেখান থেকে বিভিন্ন বিভাগে মোট ৭টি সৃজনশীল প্রশ্ন আসার কথা। এ কারণে বেশিরভাগ শিক্ষার্থী কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়কে অগ্রাধিকার দিয়ে প্রস্তুতি নিয়েছিল। তাদের তালিকায় ২, ৯, ১২ ও ১৪ নম্বর অধ্যায়গুলো অন্যতম ছিল। পরিতাপের বিষয় হলো, এসব অধ্যায় থেকে আসা প্রশ্নের সিংহভাগই ছিল ভুল।

যেমন—২(খ) ও ৪(খ) নম্বর প্রশ্নে ভুল প্রমাণ করতে বলা হয়েছে। ৮(গ) নম্বর প্রশ্নটি আদর্শ মানের হয়নি। আবার ৬(গ) নম্বর প্রশ্নের উত্তর করতে উদ্দীপকের তথ্য সংশোধনের প্রয়োজন ছিল। ভুল প্রশ্নের উত্তর করতে গিয়ে শিক্ষার্থীরা অনেক কাটাকাটি করেছে এবং এর ফলে তারা স্বাভাবিকভাবে পরীক্ষা শেষ করতে পারেনি। ঢাকা বোর্ডের প্রায় সব কেন্দ্রেই একই চিত্র দেখা গেছে। সৃজনশীল প্রশ্নে কত শতাংশ ‘উচ্চতর দক্ষতা’ থেকে আসবে তা নির্ধারিত থাকলেও এবারের প্রশ্নে তার সঠিক বাস্তবায়ন ঘটেনি।

সৃজনশীল পদ্ধতির একটি বড় দুর্বলতা হলো—একটি প্রশ্নের ক, খ, গ—সবগুলোর উত্তরই ধারাবাহিকভাবে করতে হয়। যখন একজন শিক্ষার্থী ‘খ’ নম্বর প্রশ্নে বাধার সম্মুখীন হয়, তখন তাকে পুরো প্রশ্নটিই বর্জন করতে হয়। তিনটি প্রশ্ন এভাবে ত্রুটিপূর্ণ হওয়ায় শিক্ষার্থীদের অপশন সংখ্যা অনেক কমে যায়। কাটাকাটির কারণে অনেকের ৪৫-৫০ মিনিট সময় নষ্ট হয়েছে। সময় স্বল্পতার কারণে অনেকে জানা উত্তরগুলোও শেষ করতে পারেনি। আবার অনেকে মানসিক চাপে পড়ে জানা তথ্যও ভুলে গেছে। পরিসংখ্যান মতে, বাংলাদেশের ৬০-৬৫ শতাংশ শিক্ষার্থীর মধ্যে গণিতভীতি রয়েছে। এই ভুল প্রশ্ন সেই ভীতিকে আরও ঘনীভূত করেছে। এমনিতেই এমসিকিউ সমাধানের জন্য তারা পর্যাপ্ত সময় পায়নি।

এসএসসির ফলাফল কেবল এই স্তরেই সীমাবদ্ধ নয়; পরবর্তীতে বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তির ক্ষেত্রে এসএসসি ও এইচএসসির জিপিএ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। গণিত পরীক্ষা ভালো হলে শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিজ্ঞান ও গণিতের প্রতি আগ্রহ বাড়ে। কিন্তু ভুল প্রশ্ন করলে শিক্ষার্থীদের মনে গণিতভীতি তৈরি হয়, যা ভবিষ্যতে তাদের গণিত-সংশ্লিষ্ট বিষয়ে উচ্চশিক্ষায় অনাগ্রহী করে তুলতে পারে।
সামগ্রিকভাবে বলা যায়, উচ্চতর গণিত প্রশ্নপত্রের ভুলের কারণে অসংখ্য শিক্ষার্থী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এই ক্ষতি পুষিয়ে নিতে কর্তৃপক্ষের প্রতি নিম্নলিখিত প্রস্তাবনাগুলো বিবেচনার জন্য বিশেষ অনুরোধ জানানো হচ্ছে:

১. যেসব শিক্ষার্থী এমসিকিউ ও সৃজনশীল অংশে আলাদাভাবে পাস করতে পারবে না, তাদের সমষ্টিগত নম্বরের ভিত্তিতে পাস করানোর ব্যবস্থা করা।

২. যেসব শিক্ষার্থী কয়েকবার কাটাকাটি করে ভুল প্রশ্নের উত্তর কেটে দিয়ে নতুন করে উত্তর লিখতে গিয়ে পাস করতে পারেনি, তাদের কাটা উত্তর আমলে নিয়ে পূর্ণ নম্বর দেওয়া।

৩. যারা ভুল প্রশ্নের নম্বর বাদে ৭০-৭২ নম্বর পাবে, তাদের অতিরিক্ত ১০-১২ নম্বর প্রদান করা।

৪. এত কিছুর পরেও যেসব শিক্ষার্থী উচ্চতর গণিতে অনুত্তীর্ণ হবে, তাদের পরীক্ষা-পরবর্তী ১৫-২০ দিন সময় দিয়ে নতুন প্রশ্নে পুনরায় পরীক্ষা নেওয়ার ব্যবস্থা করা।

৫. পরিস্থিতি বিবেচনায় সম্ভব হলে উচ্চতর গণিত পরীক্ষা বাতিল করে নতুন প্রশ্নে পুনরায় পরীক্ষা নেওয়া।

৬. সর্বোপরি, ভবিষ্যতে এমন কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে যেন প্রশ্নপত্রের ভুলভ্রান্তি বা ত্রুটিপূর্ণ মান নিয়ে কোমলমতি শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষের মাঝে আর কোনো ক্ষোভের সৃষ্টি না হয়।


লেখক: বিভাগীয় প্রধান; গণিত বিভাগ; নেভি অ্যাঙ্করেজ স্কুল অ্যান্ড কলেজ, ঢাকা