poetry competition feature

আমার পরিচয় আমি মা।

আমি সেই মাটি,

যার বুকে বীজ হয়ে

আমার সন্তান জন্মেছিল।

আমি সেই নদী,

যার জলে তার প্রথম হাসি ভেসেছিল।

আমি সেই আকাশ,

যার নিচে তার জন্য

একটি ঘর বানিয়েছিলাম স্বপ্নে।

আমি চেয়েছিলাম

ঝড় এলে সে আমার আঁচলে লুকাক,

রাত্রি এলে আমার বুকের কাছে ঘুমাক,

ভোর হলে দরজায় দাঁড়িয়ে

সূর্যের মতো ফিরে আসুক।

৭১ এর আকাশেও

মায়ের চোখে ছিল সেই একই সূর্য,

২৪ এর রাত্রিতেও

একই প্রদীপ জ্বলেছিল জানালায়

আমার সন্তান ফিরবে।

কিন্তু ফিরল না।

কে নিভিয়ে দিল

মায়ের ঘরের শেষ প্রদীপ?

কার হাতে রক্তের দাগ,

কার মুকুটে আমার সন্তানের

অপূর্ণ স্বপ্ন?

আজ আমার উঠোনে

ফুল ফোটে না

ফোটে রক্তের স্মৃতি।

দরজায় বাতাস কড়া নাড়লে

আমি ছুটে যাই

ভাবি, এই বুঝি সে!

না

শুধু বাতাস।

শুধু শূন্যতা।

শুধু বুকের ভেতর

একটি অনন্ত বজ্রপাত।

আমার নাম মা।

আমি সন্তানহারা মা।

আমার শূন্য কোলে আজ

দোল খায় না শিশু

দোল খায় মৃত্যুর ছায়া।

আমার চোখে আজ

অশ্রু নেই

আছে অগ্নিস্ফুলিঙ্গ।

আমার কণ্ঠে আজ

লোরি নেই

আছে বজ্রের ডাক।

আমার সন্তান নিল কারা?

যারা ’৭১-এর রক্তকে

স্বৈরাচারের রঙে রাঙায়,

যারা ’২৪-এর রক্তকে

নিজেদের সিংহাসনের সিঁড়ি বানায়

তাদের বলো

রক্তেরও কি দল আছে?

শহীদেরও কি পক্ষ থাকে?

মৃতের বুকেও কি

দলীয় প্রতীক খোঁজো?

মায়ের কান্না কি

কোনো রাজনীতি চেনে?

তোমরা রক্ত দিয়ে

সিংহাসনের পায়া গড়ো,

আর মায়ের বুকের শূন্যতাকে

বলো ইতিহাস!

তোমরা মৃতের কাঁধে

নিজেদের জয়ধ্বনি তোলো,

আর রক্তাক্ত মাটিকে

বলো রাজনীতি!

ধিক্ সেই রাজনীতি

যার মুকুটে

মায়ের সন্তানের রক্ত!

ধিক্ সেই সিংহাসন

যার পায়ের নিচে

কবরের মাটি!

তোমরা ইতিহাস লেখো

আমি রক্তের অক্ষরে

আমার সন্তানের নাম লিখি।

তোমরা সংখ্যা গোনো

আমি গুনি

একটি নামের অনুপস্থিতি।

তোমরা বলো

এ ছিল ৭১

এ ছিল ২৪

আমি বলি

এ ছিল আমার সন্তান!

আমার বুকের ভেতর

দুইটি সাল নয়

দুইটি জ্বলন্ত ক্ষত।

দুইটি নদী

রক্তের।

দুইটি শোক

একই মায়ের।

তাই আমার কান্নাকে

দুর্বলতা ভেবো না।

এই অশ্রু

শুকিয়ে গেলে

চোখে আগুন জ্বলবে।

এই বুক

ফেটে গেলে

বজ্র বের হবে।

এই মায়ের

নিঃশব্দ শোক

একদিন শিকল ভাঙার শব্দ হবে।

আর যে প্রশ্ন

আজ আমার কণ্ঠে কাঁপছে

আমার সন্তান নিল কারা?

সেই প্রশ্ন

একদিন বজ্র হয়ে

সিংহাসনের দরজায় আঘাত করবে।

কোনো মুকুট ঢাকতে পারবে না

এই রক্তের আর্তনাদ,

কোনো সিংহাসন মুছে দিতে পারবে না

মায়ের বুকের ক্ষত।

ইতিহাসের কালো পাতায়

যতই চাপা দাও এই রক্ত

মাটির নিচ থেকেও

সন্তানের নাম উঠে আসবে

বজ্রের মতো।

আমি মা।

আমি কাঁদি

কিন্তু আমার কান্নার নিচে

একটি বিদ্রোহ জেগে আছে।

আমি মা।

আমি সন্তানহারা।

আর আমার বুকের আগুনের

কোনো রাজনীতি নেই।